ঢাকা ০৮:৫৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শত্রুর ড্রোনে পা উড়ল, নিজের ছুরিতে কাটলেন অন্য পা: ৮ মাস গর্তে কাটিয়ে উদ্ধার সেনা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৪:০৬:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / 114

শত্রুর ড্রোন হামলায় উড়ে গেছে এক পা। ইনফেকশন আর তীব্র যন্ত্রণায় বাকি পা-টিও বাঁচানো অসম্ভব বুঝে নিজেই ছুরি চালিয়ে কেটে বাদ দিলেন ক্ষতস্থান! তারপর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক স্কুলের ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার ছোট্ট একটি গর্তে কেটেছে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময়। চারপাশে মৃত্যুকূপ ‘কিল জোন’, উদ্ধারে নামলেই মরতে হবে নিশ্চিত—এমন পরিস্থিতিতে কবরের মতো গর্তে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন ৪৯ বছরের ইউক্রেনীয় সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। কিন্তু যুদ্ধশাস্ত্রের সমস্ত নিয়ম উল্টে দিয়ে তাঁকে উদ্ধার করল এক বিশাল উড়ন্ত ড্রোন! আকাশে ৭০ মিটার উঁচুতে ঝুলিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ আশ্রয়ে।

রাশিয়া-ইউক্রেনের পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে এমন মহানাটকীয় ও অলৌকিক উদ্ধার অভিযান এর আগে কখনও দেখেনি বিশ্ব। ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিজের সেই শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন জীবনের শেষপ্রান্ত থেকে ফিরে আসা মেকানাইজড ব্রিগেডের বীর সদস্য কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো (৪৯)।

দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো। তবুও স্বস্তির হাসি হেসে ভ্লাসেনকো বলেন, “আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।”

সহযোদ্ধার মৃত্যু ও মৃত্যুর গর্তে আট মাস

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের মে মাসে। খারকিভ অঞ্চলের এক অতি-ঝুঁকিপূর্ণ সম্মুখসারির অবস্থান বা মাটির বাংকারে ডিউটি পালন করতে যান ভ্লাসেনকো ও তাঁর সঙ্গী ‘বাসকি’। পরিস্থিতি এতটাই বিষাক্ত ছিল যে, তাঁদের সেখানে বদলি করতে যাওয়া একের পর এক চারজন সেনা রুশ হামলায় প্রাণ হারান।

দীর্ঘ ১০ মাস এক মাটির ঘরে কাটানোর পর গত ফেব্রুয়ারিতে জমা পানিতে বাংকার ভেসে গেলে তাঁরা আশ্রয় নেন কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলে। কিন্তু বিধি বাম! শুকনো কাপড় ও খাবারের খোঁজে বের হতেই তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রুশ কামিকাজে ড্রোন। ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রাণ হারান সহযোদ্ধা বাসকি।

বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা উড়ে যায় এবং মারাত্মক আঘাত পায় ডান পা-ও। বেঁচে থাকার তাগিদে ভ্লাসেনকো টেনেহেঁচড়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটা ছোট্ট গর্তে।

নিজের ছুরি দিয়েই কেটে ফেললেন ডান পা!

কয়েক সপ্তাহ ধরে গর্তে বন্দি থাকার পর পচন ধরতে শুরু করে ক্ষতস্থানে। পচে যাওয়া মাংস আর বাইরে বেরিয়ে আসা হাড্ডি শরীরজুড়ে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বেঁচে থাকার এক চরম ও নৃশংস সিদ্ধান্ত নেন ভ্লাসেনকো। পকেট থেকে নিজের ছুরি বের করে নিজের হাতেই কেটে ফেলেন ঝুলতে থাকা ডান পায়ের নিচের অংশটুকু! রক্তপাত থামাতে শক্ত করে বাঁধেন টুর্নিকেট।

ভ্লাসেনকো স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, “আমাকে পা-টা কেটে ফেলতেই হতো। ওটা পেছনে টেনে টেনে চলছিল আর হাড়গুলো বের হয়ে আসছিল। একপর্যায়ে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।”

সামরিক ইতিহাসের প্রথম ‘উড়ন্ত ড্রোন উদ্ধার’

চারপাশে রাশিয়ান ড্রোন অহরহ চক্কর দেওয়ায় এলাকাটি পরিণত হয়েছিল ‘কিল জোনে’। স্থলপথে পিকআপ বা রোবোটিক যান দিয়ে তাঁকে উদ্ধারের সব চেষ্টা রুশ হামলায় ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে ইউক্রেনীয় কমান্ডোরা শেষ বাজিমাত করার সিদ্ধান্ত নেন।

ঝুঁকি নেওয়া হয় ‘গুরজুফ ডিফেন্স’-এর তৈরি ছয় প্রপেলারের একটি বিশেষ ভারী মালবাহী ড্রোন দিয়ে। সর্বোচ্চ ৯০ কেজি বহনে সক্ষম ড্রোনটির জন্য প্রস্তুত করা হয় ভ্লাসেনকোকে। ড্রোনের মাধ্যমে তাঁর গর্তে পাঠানো হয় একটি বিশেষ হারনেস বেল্ট এবং নির্দেশনামূলক ভিডিও নির্দেশিকা।

গত ৪ অক্টোবর শুরু হয় সেই মহা-অভিযান। মূল ড্রোনটিকে সুরক্ষা দিতে আকাশে ওড়ানো হয় আরও ৩টি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ড্রোন এবং চালানো হয় কামানের তোপ। ড্রোনটি ভ্লাসেনকোর ওপর পৌঁছালে তিনি উইঞ্চের ক্যাবেলের সঙ্গে নিজের বেল্ট লক করে দেন। মুহূর্তে ড্রোনটি তাঁকে শূন্যে তুলে নেয় মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২ ৩০ ফুট ওপরে!

মৃত্যুর কোল থেকে ড্রোনে ঝুলে আকাশে ১৫ কিলোমিটার পথ মাত্র ১৫ মিনিটে পাড়ি দিয়ে নিরাপদ সেনা ঘাঁটিতে অবতরণ করেন তিনি।

‘পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ সাঁতার জানি না!’

এত বড় মৃত্যুর থাবা থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসার পরও আকাশে ওড়ার সেই ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা ভ্লাসেনকোর কাছে ছিল আরেক তাণ্ডব। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আমি বনে আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। আমার আসল আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে, কারণ আমি তো সাঁতার জানি না!”

শত্রুর ড্রোনে পা উড়ল, নিজের ছুরিতে কাটলেন অন্য পা: ৮ মাস গর্তে কাটিয়ে উদ্ধার সেনা

আপডেট সময় : ০৪:০৬:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬

শত্রুর ড্রোন হামলায় উড়ে গেছে এক পা। ইনফেকশন আর তীব্র যন্ত্রণায় বাকি পা-টিও বাঁচানো অসম্ভব বুঝে নিজেই ছুরি চালিয়ে কেটে বাদ দিলেন ক্ষতস্থান! তারপর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এক স্কুলের ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার ছোট্ট একটি গর্তে কেটেছে দীর্ঘ আট মাসেরও বেশি সময়। চারপাশে মৃত্যুকূপ ‘কিল জোন’, উদ্ধারে নামলেই মরতে হবে নিশ্চিত—এমন পরিস্থিতিতে কবরের মতো গর্তে শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন ৪৯ বছরের ইউক্রেনীয় সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। কিন্তু যুদ্ধশাস্ত্রের সমস্ত নিয়ম উল্টে দিয়ে তাঁকে উদ্ধার করল এক বিশাল উড়ন্ত ড্রোন! আকাশে ৭০ মিটার উঁচুতে ঝুলিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে আনা হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ আশ্রয়ে।

রাশিয়া-ইউক্রেনের পাঁচ বছরের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসে এমন মহানাটকীয় ও অলৌকিক উদ্ধার অভিযান এর আগে কখনও দেখেনি বিশ্ব। ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে নিজের সেই শিহরণ জাগানো অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন জীবনের শেষপ্রান্ত থেকে ফিরে আসা মেকানাইজড ব্রিগেডের বীর সদস্য কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো (৪৯)।

দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো। তবুও স্বস্তির হাসি হেসে ভ্লাসেনকো বলেন, “আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।”

সহযোদ্ধার মৃত্যু ও মৃত্যুর গর্তে আট মাস

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের মে মাসে। খারকিভ অঞ্চলের এক অতি-ঝুঁকিপূর্ণ সম্মুখসারির অবস্থান বা মাটির বাংকারে ডিউটি পালন করতে যান ভ্লাসেনকো ও তাঁর সঙ্গী ‘বাসকি’। পরিস্থিতি এতটাই বিষাক্ত ছিল যে, তাঁদের সেখানে বদলি করতে যাওয়া একের পর এক চারজন সেনা রুশ হামলায় প্রাণ হারান।

দীর্ঘ ১০ মাস এক মাটির ঘরে কাটানোর পর গত ফেব্রুয়ারিতে জমা পানিতে বাংকার ভেসে গেলে তাঁরা আশ্রয় নেন কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলে। কিন্তু বিধি বাম! শুকনো কাপড় ও খাবারের খোঁজে বের হতেই তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রুশ কামিকাজে ড্রোন। ঘটনাস্থলেই ছিন্নভিন্ন হয়ে প্রাণ হারান সহযোদ্ধা বাসকি।

বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পা উড়ে যায় এবং মারাত্মক আঘাত পায় ডান পা-ও। বেঁচে থাকার তাগিদে ভ্লাসেনকো টেনেহেঁচড়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলেন স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে মাত্র ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটা ছোট্ট গর্তে।

নিজের ছুরি দিয়েই কেটে ফেললেন ডান পা!

কয়েক সপ্তাহ ধরে গর্তে বন্দি থাকার পর পচন ধরতে শুরু করে ক্ষতস্থানে। পচে যাওয়া মাংস আর বাইরে বেরিয়ে আসা হাড্ডি শরীরজুড়ে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছিল। বেঁচে থাকার এক চরম ও নৃশংস সিদ্ধান্ত নেন ভ্লাসেনকো। পকেট থেকে নিজের ছুরি বের করে নিজের হাতেই কেটে ফেলেন ঝুলতে থাকা ডান পায়ের নিচের অংশটুকু! রক্তপাত থামাতে শক্ত করে বাঁধেন টুর্নিকেট।

ভ্লাসেনকো স্মৃতির পাতা উল্টে বলেন, “আমাকে পা-টা কেটে ফেলতেই হতো। ওটা পেছনে টেনে টেনে চলছিল আর হাড়গুলো বের হয়ে আসছিল। একপর্যায়ে আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।”

সামরিক ইতিহাসের প্রথম ‘উড়ন্ত ড্রোন উদ্ধার’

চারপাশে রাশিয়ান ড্রোন অহরহ চক্কর দেওয়ায় এলাকাটি পরিণত হয়েছিল ‘কিল জোনে’। স্থলপথে পিকআপ বা রোবোটিক যান দিয়ে তাঁকে উদ্ধারের সব চেষ্টা রুশ হামলায় ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে ইউক্রেনীয় কমান্ডোরা শেষ বাজিমাত করার সিদ্ধান্ত নেন।

ঝুঁকি নেওয়া হয় ‘গুরজুফ ডিফেন্স’-এর তৈরি ছয় প্রপেলারের একটি বিশেষ ভারী মালবাহী ড্রোন দিয়ে। সর্বোচ্চ ৯০ কেজি বহনে সক্ষম ড্রোনটির জন্য প্রস্তুত করা হয় ভ্লাসেনকোকে। ড্রোনের মাধ্যমে তাঁর গর্তে পাঠানো হয় একটি বিশেষ হারনেস বেল্ট এবং নির্দেশনামূলক ভিডিও নির্দেশিকা।

গত ৪ অক্টোবর শুরু হয় সেই মহা-অভিযান। মূল ড্রোনটিকে সুরক্ষা দিতে আকাশে ওড়ানো হয় আরও ৩টি বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ড্রোন এবং চালানো হয় কামানের তোপ। ড্রোনটি ভ্লাসেনকোর ওপর পৌঁছালে তিনি উইঞ্চের ক্যাবেলের সঙ্গে নিজের বেল্ট লক করে দেন। মুহূর্তে ড্রোনটি তাঁকে শূন্যে তুলে নেয় মাটি থেকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২ ৩০ ফুট ওপরে!

মৃত্যুর কোল থেকে ড্রোনে ঝুলে আকাশে ১৫ কিলোমিটার পথ মাত্র ১৫ মিনিটে পাড়ি দিয়ে নিরাপদ সেনা ঘাঁটিতে অবতরণ করেন তিনি।

‘পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ সাঁতার জানি না!’

এত বড় মৃত্যুর থাবা থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে আসার পরও আকাশে ওড়ার সেই ১৫ মিনিটের অভিজ্ঞতা ভ্লাসেনকোর কাছে ছিল আরেক তাণ্ডব। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, “আমি বনে আছাড় খেয়ে পড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছিলাম না। আমার আসল আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া নিয়ে, কারণ আমি তো সাঁতার জানি না!”