ঢাকা ০৩:৩৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ: সালিশে ‘চড়-থাপ্পড়ে’ মীমাংসার চেষ্টা, হাসপাতালে শিশু

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:২২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫
  • / 663

কুষ্টিয়ায় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে স্থানীয় মাতবররা সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে চড়-থাপ্পড় মেরে মীমাংসার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার দুই দিন পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত বুধবার (১১ জুন, ২০২৫) সকালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের মাতবররা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের মীমাংসা করতে সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেন। এই বৈঠকে সমাজপ্রধান রহিম মণ্ডল ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিউর রহমান লিটন উপস্থিত ছিলেন। সালিশে অভিযুক্ত বৃদ্ধকে (বিশা, ৬০) কেবল চড়-থাপ্পড় মেরে বিষয়টি ‘শেষ’ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

ঘটনার বিবরণ ও পরিবারের বক্তব্য

মঙ্গলবার (১৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি খেলা করছে এবং তার পাশেই বাবা-মা বসে আছেন।

ভুক্তভোগীর মা জানান, ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে তিনি তার মাকে এগিয়ে দিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে প্রতিবেশী বিশা তাদের মেয়েকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে আসতে দেখে তার সন্দেহ হয়। জিজ্ঞাসা করলে শিশুটি জানায়, বিশা দাদা তার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছে।

বিষয়টি গ্রামের মুরুব্বিদের জানালে তারা পরের দিন (বৃহস্পতিবার) রাতে বাড়িতে সালিশ বসায়। সালিশে বিশাকে চড়-থাপ্পড় মেরে মাতবররা বলেন, “সালিশ শেষ।” এর পরের দিন (শুক্রবার) শিশুটি পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মামলা করতে কেউ বাধা দিয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে শিশুটির মা বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, “মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে থানায় যাইনি। মেম্বার ও সমাজ প্রধান বলেছে আগে চিকিৎসা নিয়ে আসো, তারপর মামলা করতে সব ধরনের সহযোগিতা করব। আমিও মামলা করব।”

মাতবর ও পুলিশের বক্তব্য

সালিশি বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিউর রহমান লিটন হোসেন বলেন, “ঘটনাটি জানার পর ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা করতে বলেছিলাম। তারা যায়নি। তবে সালিশে চড়-থাপ্পড় মেরে মীমাংসা করেছিল অভিযুক্ত ব্যক্তির ভাই-ভাতিজারা। আমি শুধু উপস্থিত ছিলাম।”

সমাজপ্রধান রহিম মণ্ডল বলেন, “সামাজিকভাবে আমরা একটা মীমাংসার চেষ্টা করেছিলাম। সেখানে অভিযুক্তকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছিল।” ধর্ষণের মতো ঘটনা বিচার সালিশ করে সমাধান করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রহিম মণ্ডল বলেন, “আমি তাদের মামলাও করতে বলেছিলাম; কিন্তু তারা তা করেননি। আমি সব সময় শিশুটির খবর রাখছি।”

জানা গেছে, অভিযুক্ত বিশা (৬০) একই গ্রামের মৃত হরার ছেলে। তার স্ত্রী বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন এবং তিনি সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। ঘটনা জানাজানির পর থেকে বিশা গা-ঢাকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তার পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম নিশ্চিত করেছেন, “শিশুটিকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”

পাটিকাবাড়ি ক্যাম্প পুলিশের ইনচার্জ এসআই নুরনবী বলেন, “ওসি স্যারের নির্দেশে শিশু মেয়েটিকে হাসপাতালে দেখে এসেছি। চিকিৎসা শেষে পরিবারকে থানায় আসতে বলা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

৫ বছরের শিশুকে ধর্ষণ: সালিশে ‘চড়-থাপ্পড়ে’ মীমাংসার চেষ্টা, হাসপাতালে শিশু

আপডেট সময় : ০৮:২২:৫১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০২৫

কুষ্টিয়ায় পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে ৬০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাকে স্থানীয় মাতবররা সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে চড়-থাপ্পড় মেরে মীমাংসার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার দুই দিন পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত বুধবার (১১ জুন, ২০২৫) সকালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার পাটিকাবাড়ি ইউনিয়নের একটি গ্রামে এই ঘটনা ঘটে।

ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের মাতবররা ধর্ষণের মতো গুরুতর অপরাধের মীমাংসা করতে সালিশ বৈঠকের আয়োজন করেন। এই বৈঠকে সমাজপ্রধান রহিম মণ্ডল ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিউর রহমান লিটন উপস্থিত ছিলেন। সালিশে অভিযুক্ত বৃদ্ধকে (বিশা, ৬০) কেবল চড়-থাপ্পড় মেরে বিষয়টি ‘শেষ’ করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।

ঘটনার বিবরণ ও পরিবারের বক্তব্য

মঙ্গলবার (১৭ জুন) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ বছর বয়সী শিশুটি খেলা করছে এবং তার পাশেই বাবা-মা বসে আছেন।

ভুক্তভোগীর মা জানান, ঘটনার দিন সকাল ৯টার দিকে তিনি তার মাকে এগিয়ে দিতে গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে প্রতিবেশী বিশা তাদের মেয়েকে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর মেয়েকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে ফিরে আসতে দেখে তার সন্দেহ হয়। জিজ্ঞাসা করলে শিশুটি জানায়, বিশা দাদা তার সঙ্গে খারাপ কাজ করেছে।

বিষয়টি গ্রামের মুরুব্বিদের জানালে তারা পরের দিন (বৃহস্পতিবার) রাতে বাড়িতে সালিশ বসায়। সালিশে বিশাকে চড়-থাপ্পড় মেরে মাতবররা বলেন, “সালিশ শেষ।” এর পরের দিন (শুক্রবার) শিশুটি পেটে ব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

মামলা করতে কেউ বাধা দিয়েছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে শিশুটির মা বিষয়টি এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, “মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে থানায় যাইনি। মেম্বার ও সমাজ প্রধান বলেছে আগে চিকিৎসা নিয়ে আসো, তারপর মামলা করতে সব ধরনের সহযোগিতা করব। আমিও মামলা করব।”

মাতবর ও পুলিশের বক্তব্য

সালিশি বৈঠকে উপস্থিত থাকা স্থানীয় ইউপি সদস্য মতিউর রহমান লিটন হোসেন বলেন, “ঘটনাটি জানার পর ভুক্তভোগী পরিবারকে মামলা করতে বলেছিলাম। তারা যায়নি। তবে সালিশে চড়-থাপ্পড় মেরে মীমাংসা করেছিল অভিযুক্ত ব্যক্তির ভাই-ভাতিজারা। আমি শুধু উপস্থিত ছিলাম।”

সমাজপ্রধান রহিম মণ্ডল বলেন, “সামাজিকভাবে আমরা একটা মীমাংসার চেষ্টা করেছিলাম। সেখানে অভিযুক্তকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছিল।” ধর্ষণের মতো ঘটনা বিচার সালিশ করে সমাধান করতে পারেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে রহিম মণ্ডল বলেন, “আমি তাদের মামলাও করতে বলেছিলাম; কিন্তু তারা তা করেননি। আমি সব সময় শিশুটির খবর রাখছি।”

জানা গেছে, অভিযুক্ত বিশা (৬০) একই গ্রামের মৃত হরার ছেলে। তার স্ত্রী বেশ কয়েক বছর আগে মারা গেছেন এবং তিনি সন্তানদের সঙ্গে একই বাড়িতে থাকতেন। ঘটনা জানাজানির পর থেকে বিশা গা-ঢাকা দিয়েছেন। এ বিষয়ে তার পরিবারের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) হোসেন ইমাম নিশ্চিত করেছেন, “শিশুটিকে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে। তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।”

পাটিকাবাড়ি ক্যাম্প পুলিশের ইনচার্জ এসআই নুরনবী বলেন, “ওসি স্যারের নির্দেশে শিশু মেয়েটিকে হাসপাতালে দেখে এসেছি। চিকিৎসা শেষে পরিবারকে থানায় আসতে বলা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”