ঢাকা ০১:২০ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট ভারতের’ বিতর্কিত দাবি বিজেপি এমপির

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৩১:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • / 33

স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশের সীমানা ও ভূখণ্ড নিয়ে সরাসরি হাত বাড়ানোর হুমকি! আর এবারও বিষোদগারের কেন্দ্রে ভারতের শাসকদল বিজেপির এক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা। বাংলাদেশের নোয়াখালী, সিলেট এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতের মানচিত্রে ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে বলে প্রকাশ্য দাবি করলেন ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে কাঠগড়ায় তুলে ইতিহাস বিকৃতির অজুহাতে দেওয়া এই অসংলগ্ন বক্তব্যে দুই দেশের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে বইছে তীব্র বিতর্কের ঝড়।

বাংলাদেশের নোয়াখালী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চট্টগ্রাম বন্দর এবং সিলেট জেলা ভারতের ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে বলে চরম বিতর্কিত ও অসংবেদনশীল মন্তব্য করেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে।

গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) ভারতের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিজেপি নেতা এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেন।

১৯৪৬-৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাস টেনে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের শাসকের মতামতকে তোয়াক্কা না করে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এসব অঞ্চল অন্যায়ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ) হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

নেহরুকে দায়ী করে বিজেপি এমপির বিস্ফোরক মন্তব্য

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে সরাসরি আক্রমণ করে বিজেপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ১৯৪৬ সালে ভারতের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার স্বার্থে নেহরু একতরফা সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হতে দিয়ে ভারতের মারাত্মক ক্ষতি করেছিলেন।

বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে নিশিকান্ত দুবে হুংকার ছেড়ে বলেন, “আমার মনে হয়, শুধু পাকিস্তানের কাছ থেকে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ই আসেনি; বরং নেহরু যেসব অঞ্চল জোর করে হস্তান্তর করেছিলেন, সেগুলোও ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। এর মধ্যে পরিষ্কারভাবে রয়েছে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট।”

পাশে দাঁড়িয়ে প্রদ্যোত মাণিক্যের সুর ও ‘চিকেনস নেক’ অজুহাত

বিজেপি নেতার এই অসংগত ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ববিরোধী বক্তব্যের প্রতি তাত্ক্ষণিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন ত্রিপুরার প্রবীণ রাজপরিবারের উত্তরসূরি ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ‘তিপ্রা মোথা’র প্রধান প্রদ্যোত মাণিক্য।

তিনি অভিযোগ করেন, দেশভাগের চরম সংকটকালে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল এলাকা তাঁর দাদিকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রদ্যোতের মতে, এটি ছিল ভারতের ভূরাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ভারতের আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রদ্যোত মাণিক্য আরও বলেন, “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সরাসরি সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। আজ যদি আমাদের সমুদ্রপথে সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকত, তবে শিলিগুড়ি করিডর বা তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে ভারতের আর কোনো নিরাপত্তা দুশ্চিন্তাই থাকত না।”

ইতিহাস বিকৃতি ও ত্রিপুরার রাজার বিরোধিতা

সাক্ষাৎকারে বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে দাবি করেন, ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নেহরু যখন মুসলিম লীগের সমর্থন পেতে মরিয়া ছিলেন, তখন ত্রিপুরার তৎকালীন প্রজাহিতৈষী রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নেহরুর সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করেছিলেন।

দুবে দাবি করেন, এ নিয়ে নেহরুর সঙ্গে রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। সে সময় রাজা প্রশ্ন তুলেছিলেন, “আপনারা কীভাবে নোয়াখালী পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারেন? সিলেটে কীভাবে গণভোট আয়োজন করেন? কিংবা চট্টগ্রামেই বা কীভাবে গণভোট হবে? এটি আমার রাজ্য। এটি ভারত, পাকিস্তান নাকি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেব।”

(তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু)

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেট ভারতের’ বিতর্কিত দাবি বিজেপি এমপির

আপডেট সময় : ১২:৩১:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশের সীমানা ও ভূখণ্ড নিয়ে সরাসরি হাত বাড়ানোর হুমকি! আর এবারও বিষোদগারের কেন্দ্রে ভারতের শাসকদল বিজেপির এক প্রভাবশালী আইনপ্রণেতা। বাংলাদেশের নোয়াখালী, সিলেট এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চট্টগ্রাম বন্দরকে ভারতের মানচিত্রে ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে বলে প্রকাশ্য দাবি করলেন ঝাড়খণ্ডের বিজেপি সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে কাঠগড়ায় তুলে ইতিহাস বিকৃতির অজুহাতে দেওয়া এই অসংলগ্ন বক্তব্যে দুই দেশের কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক অঙ্গনে বইছে তীব্র বিতর্কের ঝড়।

বাংলাদেশের নোয়াখালী, গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক চট্টগ্রাম বন্দর এবং সিলেট জেলা ভারতের ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে বলে চরম বিতর্কিত ও অসংবেদনশীল মন্তব্য করেছেন দেশটির ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে।

গতকাল শুক্রবার (৬ নভেম্বর ২০২৬) ভারতের প্রভাবশালী সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI)-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বিজেপি নেতা এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ দাবি করেন।

১৯৪৬-৪৭ সালের দেশভাগের ইতিহাস টেনে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের শাসকের মতামতকে তোয়াক্কা না করে স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এসব অঞ্চল অন্যায়ভাবে পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ) হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

নেহরুকে দায়ী করে বিজেপি এমপির বিস্ফোরক মন্তব্য

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে সরাসরি আক্রমণ করে বিজেপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ১৯৪৬ সালে ভারতের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সময় মুসলিম লীগের রাজনৈতিক সমর্থন নিশ্চিত করার স্বার্থে নেহরু একতরফা সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রামকে পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হতে দিয়ে ভারতের মারাত্মক ক্ষতি করেছিলেন।

বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে নিশিকান্ত দুবে হুংকার ছেড়ে বলেন, “আমার মনে হয়, শুধু পাকিস্তানের কাছ থেকে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর ফিরিয়ে নেওয়ার সময়ই আসেনি; বরং নেহরু যেসব অঞ্চল জোর করে হস্তান্তর করেছিলেন, সেগুলোও ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। এর মধ্যে পরিষ্কারভাবে রয়েছে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট।”

পাশে দাঁড়িয়ে প্রদ্যোত মাণিক্যের সুর ও ‘চিকেনস নেক’ অজুহাত

বিজেপি নেতার এই অসংগত ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ববিরোধী বক্তব্যের প্রতি তাত্ক্ষণিকভাবে সমর্থন জানিয়েছেন ত্রিপুরার প্রবীণ রাজপরিবারের উত্তরসূরি ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ‘তিপ্রা মোথা’র প্রধান প্রদ্যোত মাণিক্য।

তিনি অভিযোগ করেন, দেশভাগের চরম সংকটকালে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল এলাকা তাঁর দাদিকে পুরোপুরি অন্ধকারে রেখে পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। প্রদ্যোতের মতে, এটি ছিল ভারতের ভূরাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার ও মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে ভারতের আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রদ্যোত মাণিক্য আরও বলেন, “১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু দেশভাগের সময় চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল সরাসরি সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। আজ যদি আমাদের সমুদ্রপথে সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকত, তবে শিলিগুড়ি করিডর বা তথাকথিত ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে ভারতের আর কোনো নিরাপত্তা দুশ্চিন্তাই থাকত না।”

ইতিহাস বিকৃতি ও ত্রিপুরার রাজার বিরোধিতা

সাক্ষাৎকারে বিজেপি এমপি নিশিকান্ত দুবে দাবি করেন, ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নেহরু যখন মুসলিম লীগের সমর্থন পেতে মরিয়া ছিলেন, তখন ত্রিপুরার তৎকালীন প্রজাহিতৈষী রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্য নোয়াখালী, সিলেট ও চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নেহরুর সিদ্ধান্তের চরম বিরোধিতা করেছিলেন।

দুবে দাবি করেন, এ নিয়ে নেহরুর সঙ্গে রাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বিরোধ সৃষ্টি হয়। সে সময় রাজা প্রশ্ন তুলেছিলেন, “আপনারা কীভাবে নোয়াখালী পাকিস্তানের হাতে তুলে দিতে পারেন? সিলেটে কীভাবে গণভোট আয়োজন করেন? কিংবা চট্টগ্রামেই বা কীভাবে গণভোট হবে? এটি আমার রাজ্য। এটি ভারত, পাকিস্তান নাকি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হবে, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নেব।”

(তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু)