ঢাকা ০৯:৪০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তোলপাড় ফরিদপুর বিএনপি: কমিটিতে আ.লীগের পদধারীরা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ১১:৪৬:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫
  • / 714

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে চরম ক্ষোভ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। দলের অনেক নেতাই এই কমিটিকে সরাসরি ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন কমিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, সদ্য অনুমোদিত দুই কমিটিতে আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক বেশ কয়েকজন নেতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছেন, ফলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ও সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়ার যৌথ স্বাক্ষরে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট দুটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই এই তীব্র অসন্তোষ শুরু হয়।

বিএনপি কমিটিতে আওয়ামী লীগের পদধারীরা

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সদ্য ঘোষিত কমিটিতে বেশ কিছু বিতর্কিত নাম রয়েছে:

পদবী নাম পূর্বের বা বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়
উপজেলা সহসভাপতি (১১ নং) বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়া আসাদুজ্জামান উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং ২০২১ সালে নৌকা প্রতীকে টগরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত।
উপজেলা সহসভাপতি (৫ নং) আবদুল ওহাব ওরফে পান্নু উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য।
উপজেলা সহসভাপতি (৪ নং) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান উপজেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি।
উপজেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
উপজেলা সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওহিদ শিকদার গোপালপুর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
পৌর প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান কদর ফরিদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি।

এছাড়াও, সদস্য হিসেবে (ক্রমিক ৯৮) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার শ্যালক নুরুল ইসলামকে রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতার সাফাই: ‘চাপের মুখে সিদ্ধান্ত’

সদ্য ঘোষিত বিএনপির উপজেলা কমিটিতে সহসভাপতির পদ পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল ওহাব ওরফে পান্নু তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, তিনি তিনবার ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চেয়েও না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সুনজরে ছিলেন না।

তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর চেয়ারম্যান হিসেবে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। একদিন অফিস করেছি আবার সাত দিন পালায় থাকতে হয়েছে। রাতে বাড়িতে থাকতে পারিনি… দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।”

ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাদের অভিযোগ

‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নেই’: উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খোশবুর রহমান (যিনি কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়েছেন) বলেন, “এটি সম্পূর্ণভাবে ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন কমিটি’। ঘোষিত দুই কমিটিতে অন্তত ৭৫ শতাংশ ব্যক্তি আওয়ামী লীগের পদধারী, কর্মী বা সমর্থক।”

বঞ্চিত ত্যাগীরা: তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যারা হামলা-মামলা, জেল-জুলুম সহ্য করেছে, তাদের কেউ জায়গা পায়নি। এই কমিটি গঠিত হয়েছে ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে, কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়।”

বিএনপি ধ্বংসের চেষ্টা: বিএনপির বিভক্ত অংশের নেতা ও নবগঠিত কমিটির তিন নম্বর সহসভাপতি শামসুদ্দিন মিয়া বলেন, বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্যই আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়ে এই কমিটি করা হয়েছে।

কর্মসূচির হুঁশিয়ারি: ক্ষুব্ধ নেতারা কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোর এবং প্রয়োজনে মানববন্ধন ও সমাবেশসহ কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জেলা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া

জেলা বিএনপির বক্তব্য: জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া (স্বপন) কমিটি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সবার মতামতের ভিত্তিতেই এ কমিটি করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বর্তমান পদে আছেন, তাহলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে বাদ দেওয়া হবে।”

আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া: কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকরাম হোসেন বলেন, যারা বিএনপির কমিটিতে গেছেন, তাঁরা হয়তো জেল-জুলুম এড়াতে বা স্থানীয় নির্বাচনে সুবিধার জন্য গেছেন। তবে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে কমিটি করা ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই পরিচয়’ দেয়।

তোলপাড় ফরিদপুর বিএনপি: কমিটিতে আ.লীগের পদধারীরা

আপডেট সময় : ১১:৪৬:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৫

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা ও পৌর বিএনপির সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে দলের অভ্যন্তরে চরম ক্ষোভ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। দলের অনেক নেতাই এই কমিটিকে সরাসরি ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন কমিটি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। অভিযোগ উঠেছে, সদ্য অনুমোদিত দুই কমিটিতে আওয়ামী লীগের বর্তমান ও সাবেক বেশ কয়েকজন নেতা গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছেন, ফলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী কর্মীরা বঞ্চিত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার রাতে ফরিদপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদাররেছ আলী ও সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়ার যৌথ স্বাক্ষরে ১০১ সদস্য বিশিষ্ট দুটি কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়। কমিটি ঘোষণার পর থেকেই এই তীব্র অসন্তোষ শুরু হয়।

বিএনপি কমিটিতে আওয়ামী লীগের পদধারীরা

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সদ্য ঘোষিত কমিটিতে বেশ কিছু বিতর্কিত নাম রয়েছে:

পদবী নাম পূর্বের বা বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়
উপজেলা সহসভাপতি (১১ নং) বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়া আসাদুজ্জামান উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং ২০২১ সালে নৌকা প্রতীকে টগরবন্দ ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত।
উপজেলা সহসভাপতি (৫ নং) আবদুল ওহাব ওরফে পান্নু উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য।
উপজেলা সহসভাপতি (৪ নং) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান উপজেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি।
উপজেলা সহ-সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান গত জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন।
উপজেলা সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ওহিদ শিকদার গোপালপুর ইউনিয়ন কৃষক লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
পৌর প্রচার সম্পাদক কামরুজ্জামান কদর ফরিদপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি।

এছাড়াও, সদস্য হিসেবে (ক্রমিক ৯৮) ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার শ্যালক নুরুল ইসলামকে রাখা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতার সাফাই: ‘চাপের মুখে সিদ্ধান্ত’

সদ্য ঘোষিত বিএনপির উপজেলা কমিটিতে সহসভাপতির পদ পাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল ওহাব ওরফে পান্নু তার অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, তিনি তিনবার ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চেয়েও না পাওয়ায় স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করেন এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সুনজরে ছিলেন না।

তিনি বলেন, “সরকার পরিবর্তনের পর চেয়ারম্যান হিসেবে ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করতে পারিনি। একদিন অফিস করেছি আবার সাত দিন পালায় থাকতে হয়েছে। রাতে বাড়িতে থাকতে পারিনি… দেশের সার্বিক পরিস্থিতির কারণে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।”

ক্ষুব্ধ বিএনপি নেতাদের অভিযোগ

‘গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নেই’: উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক খোশবুর রহমান (যিনি কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়েছেন) বলেন, “এটি সম্পূর্ণভাবে ‘আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন কমিটি’। ঘোষিত দুই কমিটিতে অন্তত ৭৫ শতাংশ ব্যক্তি আওয়ামী লীগের পদধারী, কর্মী বা সমর্থক।”

বঞ্চিত ত্যাগীরা: তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যারা হামলা-মামলা, জেল-জুলুম সহ্য করেছে, তাদের কেউ জায়গা পায়নি। এই কমিটি গঠিত হয়েছে ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে, কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নয়।”

বিএনপি ধ্বংসের চেষ্টা: বিএনপির বিভক্ত অংশের নেতা ও নবগঠিত কমিটির তিন নম্বর সহসভাপতি শামসুদ্দিন মিয়া বলেন, বিএনপিকে ধ্বংস করার জন্যই আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়ে এই কমিটি করা হয়েছে।

কর্মসূচির হুঁশিয়ারি: ক্ষুব্ধ নেতারা কেন্দ্রীয় বিএনপির কাছে লিখিত অভিযোগ জানানোর এবং প্রয়োজনে মানববন্ধন ও সমাবেশসহ কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জেলা বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া

জেলা বিএনপির বক্তব্য: জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া (স্বপন) কমিটি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, সবার মতামতের ভিত্তিতেই এ কমিটি করা হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “যদি কেউ প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বর্তমান পদে আছেন, তাহলে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে বাদ দেওয়া হবে।”

আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া: কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আলফাডাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকরাম হোসেন বলেন, যারা বিএনপির কমিটিতে গেছেন, তাঁরা হয়তো জেল-জুলুম এড়াতে বা স্থানীয় নির্বাচনে সুবিধার জন্য গেছেন। তবে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে কমিটি করা ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াপনারই পরিচয়’ দেয়।