মার্কিন শুল্কের খড়্গ: ট্রাম্পের চিঠিতে ৩৫% শুল্ক, শঙ্কায় বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ০১:৩২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৯ জুলাই ২০২৫
- / 208
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পারস্পরিক শুল্কের খড়্গ নেমে এসেছে বাংলাদেশের ওপর। এতদিন গড়ে ১৫ শতাংশ শুল্ক থাকলেও, নতুন করে আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প, যা আগামী ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ, এখন থেকে বাংলাদেশি পণ্য, বিশেষত তৈরি পোশাক, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে ৫০ শতাংশ শুল্কে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি, বিশেষ করে পোশাক খাত, মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে, তবুও উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার এখনও মার্কিনীদের মন গলাতে পারছে না।
শুল্কারোপ ও উদ্বেগের কারণ
ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বসার পর গত ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্কের কথা বলা হলেও, গত সোমবার ট্রাম্প বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস-কে চিঠি দিয়েছেন। এতে সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক খাত, কারণ যুক্তরাষ্ট্রই বাংলাদেশি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি রুবানা হক এ প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “৩৫ শতাংশ মার্কিন শুল্ক বহাল থাকলে বাংলাদেশের রফতানি খাতের জন্য বিপর্যয়কর হবে।” তিনি সরকারের আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং ভিয়েতনামের মতো দেশ যেখানে ২০ শতাংশ শুল্কে পোশাক রপ্তানি করবে, সেখানে বাংলাদেশের ৩৫ শতাংশ শুল্কের বোঝা বহন করা কঠিন হবে বলে জানান। তিনি আরও যোগ করেন, আগের ১৬ শতাংশ শুল্ক যুক্ত হলে পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ, তবে আগস্ট মাস পর্যন্ত আলোচনার সুযোগ আছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই উচ্চ শুল্কহারের কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য রপ্তানি পণ্যের চাহিদা কমে যাবে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
আলোচনার গতিপ্রকৃতি ও ঢাকার কৌশল
ট্রাম্প পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার পর বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম সমস্ত মার্কিন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে দ্রুত দরকষাকষি শুরু করে এবং তাদের উপর ২০ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের ১০০টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিলেও, বাজেটের আগে সেই তালিকা যুক্তরাষ্ট্রকে সরবরাহ করেনি ঢাকা।
শুল্ক কার্যকর তিন মাস স্থগিত করার পর বাংলাদেশের মধ্যে দরকষাকষির বিষয়ে এক ধরনের ঢিলেঢালা ভাব চলে আসে। এর কারণ ছিল, ওয়াশিংটন থেকে আসা একটি বার্তা যেখানে বলা হয় যে, ৩-৪ জুলাইয়ের দিকে ট্রাম্প প্রশাসন পারস্পরিক শুল্ক কার্যকর করার সময়সীমা এক বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা ধীর গতিতে এগোনোর কৌশল নেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আকর্ষণীয় কোনো প্রস্তাব উপস্থাপন না করে উল্টো তাদের কাছে কোন কোন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা চায় তার তালিকা চায়। গত সোমবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রস্তাবিত ৩৫ শতাংশ শুল্কহারের চিঠির সঙ্গে সেই তালিকাসহ নতুন চুক্তির ডকুমেন্ট পাঠায়।
২৬ জুন ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের (ইউএসটিআর) সঙ্গে মিটিংয়ের আগে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা সমস্যা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান সরকারকে আভাস দেন যে, দরকষাকষিতে বাংলাদেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে।
চুক্তির শর্তাবলী ও ভবিষ্যত সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিতে কিছু কঠোর শর্ত দেওয়া হয়েছে, যা প্রচলিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্র্যাকটিস এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বা বাড়তি শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রকে যে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশ ছাড় দেবে, একই পণ্যের ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশকে ছাড় দেওয়া যাবে না—যা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মোস্ট-ফেভার্ড ন্যাশন (এমএফএন) নীতির বিরোধী। গত ৩ জুলাইয়ের মিটিংয়েও বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শর্তগুলো পালন করা সম্ভব নয় বলে জানায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র পরবর্তীতে বৈঠক করার ক্ষেত্রে সম্মতি দেওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন যে বাংলাদেশের প্রস্তাবে ইউএসটিআর রাজি হয়েছে।
মার্কিনীদের খুশি করতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ, এলএনজি, গম ইত্যাদি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ গতকাল বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক চূড়ান্ত নয় এবং আজকের (বুধবারের) সভায় ওয়ান-টু-ওয়ান নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে এটি ঠিক হবে। বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীনও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং আজকের বৈঠকে অংশ নেবেন। তিনি ভালো কিছু হওয়ার আশা করছেন।
বিটিটিসি-এর সাবেক সদস্য ড. মোস্তফা আবিদ খান অবশ্য মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই এলডিসিগুলোর জন্য বাড়তি সুবিধা দেয়নি, এবং বাংলাদেশ এলডিসি হলেও ভিয়েতনাম, চীন বা ভারতের চেয়ে বেশি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, তাই এলডিসি হিসেবে বাড়তি সুবিধা পাওয়ার আশা করা যৌক্তিক নয়।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন এবং বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে লবিস্ট ফার্ম নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সরকার সেই উদ্যোগ নেয়নি বলে জানা গেছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান বাবু মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে ‘আরও সুনির্দিষ্ট ও সিরিয়াস’ হওয়ার পরামর্শ পেয়েছেন।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, নতুন চুক্তির খসড়া এখনও সম্পূর্ণ পর্যালোচনা করা হয়নি। সব মিলিয়ে, ১ আগস্টের আগে আলোচনার মাধ্যমে শুল্ক কমিয়ে আনার সুযোগ থাকলেও, তা কতটা সফল হবে তা নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।


























