নদী বা খালের অস্তিত্বই নেই, তবুও ফরিদপুরে ১২ কোটিতে হচ্ছে বিশাল সেতু

- আপডেট সময় : ০৫:৩১:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
- / 29
যে স্থানে কোনো নদী, নালা বা খালের অস্তিত্ব নেই, এমনকি নেই কোনো পানি প্রবাহের ব্যবস্থা; ঠিক তেমন একটি শুষ্ক ও আবদ্ধ স্থানে প্রায় ১২ কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত হচ্ছে একটি বিশাল সড়ক সেতু! অবাস্তব মনে হলেও এমনই এক আজব ও নজিরবিহীন ঘটনা ঘটছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের স্পষ্ট দাবি, কোনো প্রয়োজন ছাড়া এখানে সেতু নির্মাণ করা মানেই সরকারি রাজস্বের বিপুল অর্থের অপচয়।
নদী-খাল উধাও, হচ্ছে সেতু:
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের গোয়ালন্দ-তাড়াইল আঞ্চলিক সড়কের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কালিখোলা এলাকায় এই সেতুটি নির্মাণ করছে ফরিদপুর সড়ক বিভাগ। স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থায়নে ৪৪ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩২ মিটার প্রস্থের এই সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১২ কোটি টাকা। বর্তমানে সেখানে সেতুর পাইলিংয়ের কাজ পুরোদমে চলছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় এই স্থানে ভুবনেশ্বর নদী থেকে বের হয়ে আসা ‘গোপালপুর শাখা খাল’ নামে একটি খালের অস্তিত্ব ছিল। সেই খালের ওপর অনেক আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) একটি ৩৬ মিটার দৈর্ঘ্যের ও ১২ ফুট প্রস্থের পুরোনো সেতু নির্মাণ করেছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং দুই পাশে ঘরবাড়ি গড়ে ওঠায় খালটি বহু আগেই সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে পানি প্রবাহের কোনো নামনিশানাও সেখানে নেই। অথচ, সেই পুরোনো জরাজীর্ণ সেতুটি ভেঙে ফেলে এখন নতুন করে এই ১২ কোটি টাকার মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও ইউপি চেয়ারম্যান:
প্রশাসনের এমন অদ্ভুত কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ফজলুল হক নামের এক বাসিন্দা জানান, “এখানে নদী-খাল-নালা কিছুই নেই। না আছে বড় কোনো জলাশয়। দুই পাশেই বাড়িঘর হয়ে গেছে। এখানে সেতুর কোনো প্রয়োজনই ছিল না। সরকারের এত বড় অংকের টাকা অযথা নষ্ট করা হচ্ছে।”
আরেক বাসিন্দা তারা প্রামাণিক বলেন, “দুই পাশে ঘরবাড়ি হয়ে যাওয়ায় পানি যাওয়ার কোনো পথই নেই, তাহলে এখানে এত বড় সেতু দিয়ে কী হবে?”
খোদ স্থানীয় রামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কাইমদ্দিন মন্ডল এই প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “কী কারণে ওখানে এত টাকা খরচ করে সেতু করা হচ্ছে তা আমার নিজের মাথাতেও আসে না। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা একদম অপচয় হচ্ছে।”
প্রকৌশলীর অদ্ভুত অজুহাত:
এদিকে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও কেন এই সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদপুর সড়ক বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) মো. জাহাঙ্গীর এক অদ্ভুত অজুহাত দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, “যেহেতু আগে এখানে একটি সেতু ছিল, তাই আমরা সেই পুরোনো কাগজের প্রতিবেদন আকারে ঢাকায় পাঠানোর পর এটি পাস হয়ে আসে। অতীতে সেতু ছিল বলেই প্রতিবেদন সেভাবে পাঠাতে হয়েছে। ওই স্থানে এখন সেতুর কোনো প্রয়োজন নেই, এটা আমরা প্রতিবেদনে লিখতে পারি না।”
সেতুটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘অবরন ট্রেডার্স লিমিটেড’-এর সাইট ইঞ্জিনিয়ার বাবু হোসেন জানিয়েছেন, বর্তমানে সেতুর নিচের পাইলিংয়ের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। তবে খালের অস্তিত্বহীন জায়গায় এই বিপুল বাজেটের সেতু নির্মাণ নিয়ে পুরো জেলাজুড়ে এখন তুমুল বিতর্ক ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।




















