ফরিদপুরে সওজের জমি দখল করে বিশাল মার্কেট

- আপডেট সময় : ০৬:১৭:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
- / 30
ফরিদপুর পৌরসভার ৪ নং ওয়ার্ডে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কোটি টাকা মূল্যের অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমি দখল করে একাধিক বহুতল ভবন ও মার্কেট নির্মাণ করেছে স্থানীয় এক সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্ত চক্র। সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর লিখিত নিষেধাজ্ঞা, খোদ পুলিশ সুপারের পাঠানো টহল পুলিশের বাধা এবং জেলা প্রশাসনের হুঁশিয়ারিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অবলীলায় এই সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করা হয়েছে। এই নজিরবিহীন দখলবাজির নেপথ্যে স্থানীয় কানাইপুর ইউনিয়ন পরিষদের এক মেম্বার এবং বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম ভাঙিয়ে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন জনৈক হামজা শেখ, উজ্জ্বল শেখ ও ভূমিদস্যু লিটন সাহা গং।
প্রকৌশলী ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা:
সরেজমিনে ও সওজ সূত্রে জানা গেছে, পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের তেঁতুলতলা নামক স্থানে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে সওজের এই নিচু ঢালু জমিটি দীর্ঘদিন ধরে বালু ও মাটি ফেলে ভরাট করে আসছিল এই চক্র। গত ২০ এপ্রিল সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদারের নেতৃত্বে একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে অবৈধ দেয়াল ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এবং কাজ বন্ধ করেন। এর কিছুদিন পর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে আবারও কাজ শুরু করলে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলামের নির্দেশে টহল পুলিশ গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খোদ দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগে, রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ের এক প্রভাবশালী কৃষক দল নেতার নাম ভাঙিয়ে রাতারাতি দুটি ভবনের ছাদসহ মার্কেট নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করে ফেলে চতুর হামজা ও উজ্জ্বল শেখ। বর্তমানে এই অবৈধ ভবনে দেদারসে দোকান বরাদ্দের বাণিজ্য চলছে।
দলবদলু ও সুবিধাবাদী চক্রের নেপথ্য কাহিনী:
স্থানীয়রা জানান, এই চক্রটি চরম সুবিধাবাদী। প্রবাসী হামজা শেখ ও তার ভাই উজ্জ্বল শেখ (যিনি নিজেকে ক্রসফায়ারে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী পরিচয় দিয়ে বেড়ান) বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির নেতাদের ঘনিষ্ঠ হয়ে জেলা পরিষদের কিছু জমি লিজ নেন। পরবর্তীতে গত নির্বাচনে তারা হঠাৎ জামায়াতের সমর্থক বনে যান। আর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার তারা নিজেদের রাতারাতি বিএনপি কর্মী দাবি করে রাজবাড়ী রাস্তার মোড়ের এক কৃষক দল নেতার বাড়ি গিয়ে ভুল বুঝিয়ে সখ্যতা গড়েন। এই কৃষক দল নেতার ঘনিষ্ঠ অন্য নেতারা অবশ্য হামজা গংদের ‘দুধের মাছি’ ও সুবিধাবাদী আখ্যা দিয়েছেন। এই বিষয়ে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ. কে. কিবরিয়া স্বপন জানান, “যদি দলের কেউ সত্যিই এই অবৈধ কাজে জড়িত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ভূমিদস্যু লিটন সাহার স্ট্যাম্প জালিয়াতি ও মন্দির দখল:
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ওই এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু লিটন সাহা সওজের অধিগ্রহণকৃত ২ শতক জমি নিজের পৈতৃক সম্পত্তি দাবি করে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। মামলা চলমান থাকা অবস্থাতেই তিনি হামজা শেখদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে স্ট্যাম্পের মাধ্যমে ওই সরকারি জমি বিক্রি করে দেন। হামজার ভাই উজ্জ্বল শেখ স্ট্যাম্পে জমি কেনার কথা স্বীকারও করেছেন। এই লিটন সাহার বিরুদ্ধে নিজ বাবার দান করা দীগনগর সাহাপাড়ার একটি ঐতিহ্যবাহী বারোয়ারি দুর্গা মন্দিরের জায়গা স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছ থেকে জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ ও মামলা রয়েছে।
সওজের বিতর্কিত সার্ভেয়ার শিপন ও এসিল্যান্ডের বক্তব্য:
সরকারি জমি রক্ষায় সওজের সার্ভেয়ার শিপনের দায়িত্ব থাকলেও তেঁতুলতলার সীমানা নিয়ে তিনি বরাবরই বিতর্কিত ও রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেছেন। ভূমিখেকোরা পুরো সওজ বিভাগে শুধু এই শিপনকেই চেনে এবং তার সাথেই গভীর সখ্যতা গড়ে তুলেছে। জেলাজুড়েই এই সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বহু অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, চক্রটির দাবি ছিল তারা ভূমি অফিস থেকে ডিসিআর কেটে এই ভবন করেছেন। তবে ফরিদপুর সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শফিকুল ইসলাম স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “সড়ক বিভাগের জমি আমাদের লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।” সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ সাইফুল্লাহ সরদারও ডিসিআরের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা উল্লেখ করে বলেন, “কাউকে কোনো জমি লিজ দেওয়া হয়নি। শীঘ্রই তেঁতুলতলায় বেদখল হওয়া সরকারি জমি গুঁড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে এবং মামলা করা হবে।”
ডিসি ও ওসির কঠোর হুঁশিয়ারি:
এই নজিরবিহীন জবরদখলের বিষয়ে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মাজহারুল ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সরকার বিভিন্ন প্রয়োজনে ভূমি অধিগ্রহণ করে থাকে। সেসব জমি অবৈধভাবে দখল করে কারও মার্কেট নির্মাণের সুযোগ নাই। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।” অন্যদিকে ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, “সওজ বিভাগ থেকে লিখিত অভিযোগ বা এজাহার পেলেই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও সম্পদ রক্ষায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















