ঢাকা ০৪:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে সাংবাদিকের ওপর হামলা: অতঃপর সাড়ে ৩১ লাখ টাকার বিস্ফোরক তথ্য

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৫:০৯:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬
  • / 138

ফরিদপুরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও দেশ টিভির জেলা প্রতিনিধি আনিচুর রহমানের ওপর হাসপাতালে গিয়ে হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ভিন্ন মাত্রায় রূপ নিয়েছে। পেশাগত কাজের জেরে এই হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এলেও, ঘটনার নেপথ্যে সাংবাদিক পরিচয়ে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির এক বিস্ফোরক পাল্টা দাবি উঠেছে। এ নিয়ে অভিযুক্ত যুবক রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করায় জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

হাসপাতালে হামলা ও ৩ দিন পর ভিডিও ফাঁস:

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাংবাদিক আনিচুর রহমানের স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না। গত ২০ মে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে যান তিনি। সেখানে কথাবার্তার একপর্যায়ে সাব্বির নামের এক যুবকসহ আরও দু-একজন তার ওপর চড়াও হয়ে কিলঘুষি মারেন। সিসিটিভি ফুটেজে এই মারধরের দৃশ্য ধরা পড়ে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনার প্রথম তিন দিন স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও বিষয়টি জানতে পারেননি। গত ২৩ মে (শনিবার) সিসিটিভি ফুটেজের ওই ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

থানায় সাংবাদিকের অভিযোগ:

ভিডিওটি প্রকাশের পর জানা যায়, ঘটনার পরদিনই (২১ মে) আনিচুর রহমান কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, ভাঙ্গায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি সড়ক নির্মাণকাজের তথ্য সংগ্রহের জেরে ঠিকাদার সাইদুর রহমান জেভির লোকজন তাকে তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয় এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে। তারই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তবে ওই ঘটনা নিয়ে তিনি কোনো সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিস্ফোরক পাল্টা অভিযোগ:

এদিকে সাংবাদিকের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত সাব্বির ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতের বলে দাবি করেছেন। তিনি ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর একটি পাল্টা লিখিত অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি সাংবাদিক আনিচুরের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তর থেকে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন।

সাব্বিরের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার একজন সার্ভেয়ারের কাছ থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছেলেদের নাম ও প্রভাব খাটিয়ে দুই দফায় মোট ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নেন আনিচুর রহমান। ওই চাঁদাবাজিতে সাব্বিরের নাম ব্যবহার করায় বিভিন্ন মহল থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যার ফলে তিনি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চরম হেনস্তার শিকার হন। অপমানে ও ক্ষোভে তিনি ফরিদপুর ছেড়ে ঢাকায় একটি চাকরিতে যোগ দেন।

হাতাহাতির আসল কারণ কী?

সংবাদ সম্মেলনে সাব্বির বলেন, ঈদের ছুটিতে ফরিদপুর এসে তিনি আনিচুর রহমানের কাছে এই চাঁদাবাজির সত্যতা জানতে চান। আনিচুর প্রথমে দেখা করতে না চাইলেও পরে তাকে ডায়াবেটিস হাসপাতালে ডাকেন। সেখানে সাব্বির যখন সার্ভেয়ারের কাছ থেকে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়ে জবাবদিহি চান, তখন আনিচুর রহমান শহরের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বলে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। এই নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

সাব্বির স্পষ্ট করে বলেন, “এলজিইডির যে কাজের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার সাথে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। মামলায় যাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, তাকে আমি চিনিও না। এটি কোনো সাংবাদিকতার বিষয় নয়, বরং সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি ধামাচাপা দিতে আমার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা সাজানো হচ্ছে।” তিনি ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান।

সচেতন মহলের উদ্বেগ:

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সংবাদকর্মীর ওপর হামলা যেমন অনভিপ্রেত, তেমনি সাংবাদিকতার আড়ালে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির এই বিস্ফোরক অভিযোগ ফরিদপুরের সচেতন মহলকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের উচিত কোনো মহলের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য এবং অপরাধীকে আড়াল থেকে বের করে আনা।

ফরিদপুরে সাংবাদিকের ওপর হামলা: অতঃপর সাড়ে ৩১ লাখ টাকার বিস্ফোরক তথ্য

আপডেট সময় : ০৫:০৯:১৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৭ মে ২০২৬

ফরিদপুরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ও দেশ টিভির জেলা প্রতিনিধি আনিচুর রহমানের ওপর হাসপাতালে গিয়ে হামলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি ভিন্ন মাত্রায় রূপ নিয়েছে। পেশাগত কাজের জেরে এই হামলা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর এলেও, ঘটনার নেপথ্যে সাংবাদিক পরিচয়ে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির এক বিস্ফোরক পাল্টা দাবি উঠেছে। এ নিয়ে অভিযুক্ত যুবক রীতিমতো সংবাদ সম্মেলন করায় জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

হাসপাতালে হামলা ও ৩ দিন পর ভিডিও ফাঁস:

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাংবাদিক আনিচুর রহমানের স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকায় তার দিনকাল ভালো যাচ্ছিল না। গত ২০ মে বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে ফরিদপুর ডায়াবেটিস হাসপাতালে যান তিনি। সেখানে কথাবার্তার একপর্যায়ে সাব্বির নামের এক যুবকসহ আরও দু-একজন তার ওপর চড়াও হয়ে কিলঘুষি মারেন। সিসিটিভি ফুটেজে এই মারধরের দৃশ্য ধরা পড়ে।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঘটনার প্রথম তিন দিন স্থানীয় সংবাদকর্মীরাও বিষয়টি জানতে পারেননি। গত ২৩ মে (শনিবার) সিসিটিভি ফুটেজের ওই ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।

থানায় সাংবাদিকের অভিযোগ:

ভিডিওটি প্রকাশের পর জানা যায়, ঘটনার পরদিনই (২১ মে) আনিচুর রহমান কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, ভাঙ্গায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি সড়ক নির্মাণকাজের তথ্য সংগ্রহের জেরে ঠিকাদার সাইদুর রহমান জেভির লোকজন তাকে তথ্য সংগ্রহে বাধা দেয় এবং সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করে। তারই ধারাবাহিকতায় হাসপাতালে তার ওপর হামলা চালানো হয়। তবে ওই ঘটনা নিয়ে তিনি কোনো সংবাদ প্রকাশ করেছিলেন কিনা, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিস্ফোরক পাল্টা অভিযোগ:

এদিকে সাংবাদিকের ওপর হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযুক্ত সাব্বির ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন খাতের বলে দাবি করেছেন। তিনি ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর একটি পাল্টা লিখিত অভিযোগপত্র দেওয়ার পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলন করেছেন। সেখানে তিনি সাংবাদিক আনিচুরের বিরুদ্ধে সরকারি দপ্তর থেকে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা চাঁদাবাজির বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন।

সাব্বিরের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ভূমি অধিগ্রহণ (এলএ) শাখার একজন সার্ভেয়ারের কাছ থেকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ছেলেদের নাম ও প্রভাব খাটিয়ে দুই দফায় মোট ৩১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা নেন আনিচুর রহমান। ওই চাঁদাবাজিতে সাব্বিরের নাম ব্যবহার করায় বিভিন্ন মহল থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, যার ফলে তিনি পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চরম হেনস্তার শিকার হন। অপমানে ও ক্ষোভে তিনি ফরিদপুর ছেড়ে ঢাকায় একটি চাকরিতে যোগ দেন।

হাতাহাতির আসল কারণ কী?

সংবাদ সম্মেলনে সাব্বির বলেন, ঈদের ছুটিতে ফরিদপুর এসে তিনি আনিচুর রহমানের কাছে এই চাঁদাবাজির সত্যতা জানতে চান। আনিচুর প্রথমে দেখা করতে না চাইলেও পরে তাকে ডায়াবেটিস হাসপাতালে ডাকেন। সেখানে সাব্বির যখন সার্ভেয়ারের কাছ থেকে সাড়ে ৩১ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়ে জবাবদিহি চান, তখন আনিচুর রহমান শহরের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম বলে তাকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করেন। এই নিয়ে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

সাব্বির স্পষ্ট করে বলেন, “এলজিইডির যে কাজের তথ্য সংগ্রহে বাধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার সাথে আমার বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। মামলায় যাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে, তাকে আমি চিনিও না। এটি কোনো সাংবাদিকতার বিষয় নয়, বরং সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি ধামাচাপা দিতে আমার বিরুদ্ধে ভিন্ন মামলা সাজানো হচ্ছে।” তিনি ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানান।

সচেতন মহলের উদ্বেগ:

পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সংবাদকর্মীর ওপর হামলা যেমন অনভিপ্রেত, তেমনি সাংবাদিকতার আড়ালে বিপুল অঙ্কের চাঁদাবাজির এই বিস্ফোরক অভিযোগ ফরিদপুরের সচেতন মহলকে দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রশাসনের উচিত কোনো মহলের দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য এবং অপরাধীকে আড়াল থেকে বের করে আনা।