বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা
দেশে মোট গাঁজাখোর ৬১ লাখ
- আপডেট সময় : ১০:১০:৩৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / 51
বাংলাদেশে মাদক ব্যবহারের এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক জাতীয় গবেষণায়। দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হচ্ছে গাঁজা, আর এককভাবে গাঁজাসেবীর সংখ্যাই প্রায় ৬১ লাখ।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেড যৌথভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এই যুগান্তকারী গবেষণাটি পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা এবং ২৬টি উপজেলায় মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে এই সমীক্ষা সম্পন্ন করা হয়।
শীর্ষে ময়মনসিংহ, সংখ্যায় বেশি ঢাকা:
গবেষণার বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারের শতকরা হারে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগ, যেখানে আসক্তির হার ৬ দশমিক ০২ শতাংশ। এর ঠিক পরেই রয়েছে রংপুর (৬ শতাংশ) এবং চট্টগ্রাম বিভাগ (৫ দশমিক ৫০ শতাংশ)। তবে জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বেশি মাদকসেবী রয়েছে ঢাকা বিভাগে, যার পরিমাণ প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার। গাঁজার পাশাপাশি দেশে ইয়াবা, অ্যালকোহল, কফ সিরাপ ও হেরোইনের ব্যবহারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
স্কুলজীবনেই মাদকে হাতেখড়ি ৩৩ শতাংশের!
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, মাদকসেবীদের সিংহভাগই দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী মাত্র ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সের মধ্যে (অর্থাৎ স্কুলজীবনেই) প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। আর ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে মাদকাসক্ত হয়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ তরুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, হতাশা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক নানা সংকটের কারণেই তরুণরা এই মরণনেশার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এছাড়া গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশ মাদকসেবীই স্বীকার করেছেন যে, তাদের হাতের কাছেই মাদক অত্যন্ত সহজে পাওয়া যায়।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে বড় ঘাটতি:
মাদকাসক্তি থেকে ফিরে আসার ক্ষেত্রে দেশের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার এক বড় ঘাটতির চিত্র এই গবেষণায় স্পষ্ট হয়েছে। মাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী কোনো ধরনের চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা পেয়েছেন। বাকিরা মাদক ছাড়তে চাইলেও সঠিক গাইডলাইনের অভাবে পারছেন না। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৬৯ শতাংশ মাদকসেবী পুনর্বাসন সুবিধা এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবার তীব্র প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞ ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য:
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, “মাদক সমস্যা কেবল কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয় নয়; এটি এখন একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। এই মহামারি মোকাবিলা করতে হলে শক্তিশালী রাজনৈতিক অঙ্গীকার, গবেষণাভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, “দেশে মাদকাসক্তির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। সরকার ইতোমধ্যে দেশের সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। তবে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টায় একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।”























