ঢাকা ১০:০৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘এমপি স্যারকে বলি!’ ফরিদপুরে নেতার ‘তদবির’, এসি ল্যান্ডের অডিও ফাঁসে তোলপাড়

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৪:১৩:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬
  • / 413

আইনের হাত বনাম রাজনীতির দাপট— চিরন্তন এই দ্বৈরথের এক টানটান দৃশ্যপট তৈরি হলো ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। ভূমি অফিসের এক ‘দালাল’কে সাজা দেওয়া থেকে বিচারককে বিরত রাখতে ওড়ানোর চেষ্টা হলো রাজনৈতিক ছাতা। তবে শেষরক্ষা হয়নি। রাজনীতির চেনা সমীকরণ আর ‘এমপি স্যারে’র প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই নিজের দেওয়া রায়ে অনড় থাকলেন ম্যাজিস্ট্রেট। আর এই গোটা পর্বের একটি বিস্ফোরক অডিও ক্লিপ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই জেলাজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে।

অভিযুক্তের নাম মিলন (২৯)। আলফাডাঙ্গা পৌরসভার কুসুমদী গ্রামের এই বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বাইরে কম্পিউটারের দোকান খুলে বসেছিলেন। অভিযোগ, সেই দোকানের আড়ালেই চলত সরকারি ফাইলের ‘দলাদলি’। জমির নামজারি, খাজনা বা অন্যান্য জটিল সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতেন তিনি। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও শোনেননি। অবশেষে মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর দোকানে হানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অপরাধের প্রমাণ মিলতেই ভোক্তা অধিকার আইনে তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ফাঁস হওয়া অডিও: রাজনীতির অন্দরমহল

নাটকের আসল অঙ্কটি শুরু হয় সাজার প্রক্রিয়া চলাকালীন। মিলনকে বাঁচিয়ে নিতে আসরে নামেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপজেলা আহ্বায়ক আব্দুল জলিল। বুধবার বিকেলে সমাজমাধ্যমে ফাঁস হওয়া এক অডিও ক্লিপে (যার সত্যতা যাচাই করেনি সংবাদমাধ্যম) শোনা যায় সেই রুদ্ধশ্বাস দর কষাকষির নমুনা।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম রায়হানুর রহমানকে ফোনে এনসিপি নেতা জলিলকে বলতে শোনা যায়, “মিলন আমাদের দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। তাকে একবার শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিন।”

আইনের বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট অপারগতা প্রকাশ করতেই খসে পড়ে বিনয়ের মুখোশ। কিছুটা চড়া সুরে নেতা বলে ওঠেন, “ঠিক আছে, এমপি স্যারকে বলি!” ব্যস, এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ক্ষমতার অলিন্দে থাকা চেনা দাপটের সমীকরণ।

“অপরাধীর পাশে দাঁড়ালে ব্যবস্থা”— দলীয় কোন্দল ও ক্ষোভ

এই ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এনসিপি নেতা আব্দুল জলিল অবশ্য কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি, “দলীয় নেতার বিষয়টি জানতে পেরে এসি ল্যান্ডকে ফোন করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত তথ্য জেনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছি।”

তবে ঘরের ভেতরের এই কেলেঙ্কারিতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে দলটির জেলা নেতৃত্ব। ফরিদপুর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান অপু ঠাকুর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “এ ধরনের অপরাধীর পক্ষে সুপারিশ করা সম্পূর্ণ সাংগঠনিক আইন পরিপন্থি। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ম্যাজিস্ট্রেটের জবানবন্দি

অন্যদিকে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম রায়হানুর রহমান বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। অফিসের বাইরে তাঁর ঘোরার ভিডিও ফুটেজও রয়েছে। আইন অনুযায়ী তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে।” তবে ক্ষমতার এই অলিখিত চাপ নিয়ে কিছুটা আক্ষেপের সুরেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কীভাবে ভালো কাজ করবেন? অপরাধীকে সাজা দিলে স্বজনরা অনুরোধ করবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় পরিচয় দিয়ে এই যে সুপারিশগুলো আসে— এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কী? দয়া করে বলবেন।”

আইনের কানুন বনাম ক্ষমতার দালিলিক লড়াইয়ে আলফাডাঙ্গার এই ঘটনা এখন জেলার চায়ের টেবিল থেকে রাজনৈতিক অলিন্দ— সবখানেই একমাত্র চর্চার বিষয়।

‘এমপি স্যারকে বলি!’ ফরিদপুরে নেতার ‘তদবির’, এসি ল্যান্ডের অডিও ফাঁসে তোলপাড়

আপডেট সময় : ০৪:১৩:৫৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই ২০২৬

আইনের হাত বনাম রাজনীতির দাপট— চিরন্তন এই দ্বৈরথের এক টানটান দৃশ্যপট তৈরি হলো ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। ভূমি অফিসের এক ‘দালাল’কে সাজা দেওয়া থেকে বিচারককে বিরত রাখতে ওড়ানোর চেষ্টা হলো রাজনৈতিক ছাতা। তবে শেষরক্ষা হয়নি। রাজনীতির চেনা সমীকরণ আর ‘এমপি স্যারে’র প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করেই নিজের দেওয়া রায়ে অনড় থাকলেন ম্যাজিস্ট্রেট। আর এই গোটা পর্বের একটি বিস্ফোরক অডিও ক্লিপ সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই জেলাজুড়ে শোরগোল পড়ে গেছে।

অভিযুক্তের নাম মিলন (২৯)। আলফাডাঙ্গা পৌরসভার কুসুমদী গ্রামের এই বাসিন্দা দীর্ঘদিন ধরেই সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের বাইরে কম্পিউটারের দোকান খুলে বসেছিলেন। অভিযোগ, সেই দোকানের আড়ালেই চলত সরকারি ফাইলের ‘দলাদলি’। জমির নামজারি, খাজনা বা অন্যান্য জটিল সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার টোপ দিয়ে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতেন তিনি। বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও শোনেননি। অবশেষে মঙ্গলবার বিকেলে তাঁর দোকানে হানা দেয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। অপরাধের প্রমাণ মিলতেই ভোক্তা অধিকার আইনে তাঁকে এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ফাঁস হওয়া অডিও: রাজনীতির অন্দরমহল

নাটকের আসল অঙ্কটি শুরু হয় সাজার প্রক্রিয়া চলাকালীন। মিলনকে বাঁচিয়ে নিতে আসরে নামেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উপজেলা আহ্বায়ক আব্দুল জলিল। বুধবার বিকেলে সমাজমাধ্যমে ফাঁস হওয়া এক অডিও ক্লিপে (যার সত্যতা যাচাই করেনি সংবাদমাধ্যম) শোনা যায় সেই রুদ্ধশ্বাস দর কষাকষির নমুনা।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম রায়হানুর রহমানকে ফোনে এনসিপি নেতা জলিলকে বলতে শোনা যায়, “মিলন আমাদের দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। তাকে একবার শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিন।”

আইনের বাধ্যবাধকতার কথা জানিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট অপারগতা প্রকাশ করতেই খসে পড়ে বিনয়ের মুখোশ। কিছুটা চড়া সুরে নেতা বলে ওঠেন, “ঠিক আছে, এমপি স্যারকে বলি!” ব্যস, এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় ক্ষমতার অলিন্দে থাকা চেনা দাপটের সমীকরণ।

“অপরাধীর পাশে দাঁড়ালে ব্যবস্থা”— দলীয় কোন্দল ও ক্ষোভ

এই ফোনালাপের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এনসিপি নেতা আব্দুল জলিল অবশ্য কিছুটা ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা করেছেন। তাঁর দাবি, “দলীয় নেতার বিষয়টি জানতে পেরে এসি ল্যান্ডকে ফোন করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত তথ্য জেনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছি।”

তবে ঘরের ভেতরের এই কেলেঙ্কারিতে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে দলটির জেলা নেতৃত্ব। ফরিদপুর জেলা এনসিপির আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান অপু ঠাকুর ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “এ ধরনের অপরাধীর পক্ষে সুপারিশ করা সম্পূর্ণ সাংগঠনিক আইন পরিপন্থি। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ম্যাজিস্ট্রেটের জবানবন্দি

অন্যদিকে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ কে এম রায়হানুর রহমান বলেন, “অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন। অফিসের বাইরে তাঁর ঘোরার ভিডিও ফুটেজও রয়েছে। আইন অনুযায়ী তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে।” তবে ক্ষমতার এই অলিখিত চাপ নিয়ে কিছুটা আক্ষেপের সুরেই তিনি প্রশ্ন তোলেন, “কীভাবে ভালো কাজ করবেন? অপরাধীকে সাজা দিলে স্বজনরা অনুরোধ করবে, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু দলীয় পরিচয় দিয়ে এই যে সুপারিশগুলো আসে— এ বিষয়ে আপনাদের মতামত কী? দয়া করে বলবেন।”

আইনের কানুন বনাম ক্ষমতার দালিলিক লড়াইয়ে আলফাডাঙ্গার এই ঘটনা এখন জেলার চায়ের টেবিল থেকে রাজনৈতিক অলিন্দ— সবখানেই একমাত্র চর্চার বিষয়।