ঢাকা ০২:২২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে ২৮ বছরের কবরস্থান গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৩:১৭:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
  • / 104

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নের পাঁচকাইচাইল গ্রামে দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর ধরে ব্যবহৃত একটি গণ-কবরস্থানের জমি নিয়ে চরম বিরোধ ও তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দুই গ্রামের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত এই পবিত্র কবরস্থানের জমি গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সারোয়ার মাতুব্বর নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষ ও গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

২৮ বছরের আবেগ, রয়েছে আড়াইশো কবর:

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচকাইচাইল ও মাঝিকান্দা—এই দুই গ্রামের মানুষের দাফনের সুবিধার্থে প্রায় তিন দশক আগে জমিটি কবরস্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকে দুই গ্রামের বাসিন্দারা তাদের প্রয়াত স্বজনদের এই কবরস্থানে দাফন করে আসছেন। এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমানে এই তিন শতকে সেখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মৃত মানুষের কবর রয়েছে, যা পুরো এলাকার মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের সাথে জড়িত।

বাথরুম নির্মাণ ও ময়লা ফেলার ন্যাক্কারজনক অভিযোগ:

গ্রামবাসীর অভিযোগ, সম্প্রতি সারোয়ার মাতুব্বর আচমকা ওই জমির একক মালিকানা দাবি করে গোপনে নিজের নামে দলিল ও রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। শুধু তাই নয়, পবিত্র কবরস্থানের একটি অংশে জোরপূর্বক বাথরুম নির্মাণ এবং সেখানে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এই ঘটনায় স্থানীয়দের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লেগেছে বলে দাবি করেছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

একাধিক স্থানীয় মুরুব্বি ও বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে আমাদের বাবা-দাদা ও পরম আত্মীয়-স্বজনদের শেষ স্মৃতি ঘুমিয়ে আছে। এই পবিত্র স্থান যদি ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়, তবে আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর হুমকির মুখে পড়বে। আমরা যেকোনো মূল্যে এই জমি সংরক্ষণ ও এর স্থায়ী সমাধান চাই।” স্থানীয়রা জানান, ইতিপূর্বে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও অভিযুক্তের একগুঁয়েমির কারণে কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি।

অভিযুক্তের দায়সারা বক্তব্য:

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত জমি এত বছর পর হঠাৎ নিজের নামে রেজিস্ট্রেশন করার কারণ জানতে চাইলে কোনো স্পষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি অভিযুক্ত সারোয়ার মাতুব্বর। তবে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, “আমি প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে অনেক বছর আগে মৌখিকভাবে জমিটি ক্রয় করেছিলাম। প্রায় এক মাস আগে জমিটি রেজিস্ট্রি করে নিজের নামে দলিল করেছি। এখন গ্রামের লোকজন সেই জমি ফেরত চাইছে।”

তৎপর প্রশাসন ও পুলিশ:

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত বুধবার (৩ জুন) বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত ও তৎপরতা শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কাইচাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা খান, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং নগরকান্দা থানা পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করতে জরুরি আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা খান বলেন, “কবরস্থানের মতো একটি সংবেদনশীল জমি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এলাকার মুরুব্বি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। কবরস্থানের স্বার্থ ও পবিত্রতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আমরা একে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এলাকায় যাতে কোনো ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবণতি না ঘটে, সে জন্য সবাইকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমি নিজে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছি।”

ফরিদপুরে ২৮ বছরের কবরস্থান গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি

আপডেট সময় : ০৩:১৭:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল ইউনিয়নের পাঁচকাইচাইল গ্রামে দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর ধরে ব্যবহৃত একটি গণ-কবরস্থানের জমি নিয়ে চরম বিরোধ ও তীব্র উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দুই গ্রামের মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত এই পবিত্র কবরস্থানের জমি গোপনে নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সারোয়ার মাতুব্বর নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় পুরো এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষ ও গভীর উদ্বেগ বিরাজ করছে।

২৮ বছরের আবেগ, রয়েছে আড়াইশো কবর:

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাঁচকাইচাইল ও মাঝিকান্দা—এই দুই গ্রামের মানুষের দাফনের সুবিধার্থে প্রায় তিন দশক আগে জমিটি কবরস্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এরপর থেকে দুই গ্রামের বাসিন্দারা তাদের প্রয়াত স্বজনদের এই কবরস্থানে দাফন করে আসছেন। এলাকাবাসীর দাবি, বর্তমানে এই তিন শতকে সেখানে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন মৃত মানুষের কবর রয়েছে, যা পুরো এলাকার মানুষের ধর্মীয় আবেগ ও বিশ্বাসের সাথে জড়িত।

বাথরুম নির্মাণ ও ময়লা ফেলার ন্যাক্কারজনক অভিযোগ:

গ্রামবাসীর অভিযোগ, সম্প্রতি সারোয়ার মাতুব্বর আচমকা ওই জমির একক মালিকানা দাবি করে গোপনে নিজের নামে দলিল ও রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করেছেন। শুধু তাই নয়, পবিত্র কবরস্থানের একটি অংশে জোরপূর্বক বাথরুম নির্মাণ এবং সেখানে নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। এই ঘটনায় স্থানীয়দের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত লেগেছে বলে দাবি করেছেন ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা।

একাধিক স্থানীয় মুরুব্বি ও বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে আমাদের বাবা-দাদা ও পরম আত্মীয়-স্বজনদের শেষ স্মৃতি ঘুমিয়ে আছে। এই পবিত্র স্থান যদি ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যায়, তবে আমাদের পূর্বপুরুষদের কবর হুমকির মুখে পড়বে। আমরা যেকোনো মূল্যে এই জমি সংরক্ষণ ও এর স্থায়ী সমাধান চাই।” স্থানীয়রা জানান, ইতিপূর্বে বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সালিশি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও অভিযুক্তের একগুঁয়েমির কারণে কোনো কার্যকর সমাধান হয়নি।

অভিযুক্তের দায়সারা বক্তব্য:

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহৃত জমি এত বছর পর হঠাৎ নিজের নামে রেজিস্ট্রেশন করার কারণ জানতে চাইলে কোনো স্পষ্ট ও যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি অভিযুক্ত সারোয়ার মাতুব্বর। তবে নিজের পক্ষে সাফাই গেয়ে তিনি দাবি করেন, “আমি প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে অনেক বছর আগে মৌখিকভাবে জমিটি ক্রয় করেছিলাম। প্রায় এক মাস আগে জমিটি রেজিস্ট্রি করে নিজের নামে দলিল করেছি। এখন গ্রামের লোকজন সেই জমি ফেরত চাইছে।”

তৎপর প্রশাসন ও পুলিশ:

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে গত বুধবার (৩ জুন) বিষয়টি নিয়ে সরেজমিনে তদন্ত ও তৎপরতা শুরু করেছে স্থানীয় প্রশাসন। কাইচাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোস্তফা খান, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং নগরকান্দা থানা পুলিশ ঘটনাটি নিয়ে উভয় পক্ষকে শান্ত করতে জরুরি আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

কাইচাইল ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফা খান বলেন, “কবরস্থানের মতো একটি সংবেদনশীল জমি নিয়ে সৃষ্ট বিরোধ নিরসনে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। এলাকার মুরুব্বি ও সংশ্লিষ্টদের নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে। কবরস্থানের স্বার্থ ও পবিত্রতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের আইনি ও সামাজিক উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় আমরা একে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এলাকায় যাতে কোনো ধরনের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবণতি না ঘটে, সে জন্য সবাইকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আমি নিজে পুলিশ সদস্যদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং ঘটনার ওপর কড়া নজর রাখছি।”