ঢাকা ০২:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশ পিটিয়ে বিএনপি নেতাকে ছিনতাই

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৯:০৬:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
  • / 60

যশোরের শার্শায় এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে জখম করার মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করতে গিয়ে নজিরবিহীন মব (উত্তেজিত জনতা)-এর শিকার হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর নাটকীয়ভাবে গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে কয়েকশত বাসিন্দা জড়ো করে পুলিশের হাত থেকে ওই বিএনপি নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ও আইন অমান্যের ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মসজিদের মাইকে ঘোষণা ও মব সৃষ্টি:

শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে থানা ও ডিবি পুলিশের একটি যৌথ টিম শ্যামলাগাছি গ্রামে অভিযান চালায়। পুলিশ টিমটি গ্রামের একটি মোড় থেকে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করে।

ঠিক তখনই মিন্টুর সমর্থকরা কৌশল হিসেবে গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দিতে শুরু করে যে, “মোস্তফা কামাল মিন্টুকে পুলিশ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।” গ্রামবাসীকে দ্রুত প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হলে মাইকের ঘোষণা শুনে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশত ক্ষুব্ধ নারী-পুরুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে ছুটে আসেন এবং পুলিশ সদস্যদের চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে মব সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে জনরোষের মুখে টিকতে না পেরে আসামিকে রেখেই ফিরে যেতে বাধ্য হয় যৌথ পুলিশ বাহিনী।

নেপথ্যে চাঁদা দাবি ও পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা:

মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, ট্যুরিস্ট পুলিশের হেডকোয়ার্টারে নায়েক পদে কর্মরত মামুন হাসান ওরফে জুয়েল নামের এক পুলিশ সদস্য কোরবানির ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি শ্যামলাগাছিতে এসেছিলেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মামুন হাসানের বাবার ১৫ লাখ টাকার বালু বিক্রিতে বাধা দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি আসছিল আসামিরা। ঈদে বাড়িতে এসে মামুন হাসান বিষয়টি নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের কাছে নালিশ করায় ক্ষিপ্ত হন মিন্টু ও তাঁর সহযোগীরা।

এরই জেরে গত ২৯ মে বিকেলে বাড়ি থেকে শার্শা বাজারে যাওয়ার পথে শ্যামলাগাছি গ্রামের একটি চায়ের দোকানের সামনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মামুন হাসানের গতিরোধ করে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মেহেদী হাসান রয়েল বাদী হয়ে ৪ জুন শার্শা থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয় মোস্তফা কামাল মিন্টুকে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মিন্টুর দুই ভাই লাল্টু ও পিন্টুসহ সুজন, সবুজ ও টিটন।

আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার, তালাবদ্ধ বাড়ি:

এদিকে এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যের পরিবার। আসামিদের অব্যাহত হুমকি-ধমকির মুখে পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। শুক্রবার ওই বাড়িতে গিয়ে প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। ভেতর থেকে নিচু স্বরে কথা বলেন মামুনের ছোট চাচা সফিয়ার রহমান। তিনি বলেন, “আসামিরা আমাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি, কেউ বাড়িতে ঘুমাতে পারছি না।”

অভিযুক্তের দাবি ও পুলিশের অবস্থান:

অবশ্য মব সৃষ্টি করে পার পেয়ে যাওয়া বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টু তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা ওয়ারেন্ট ছিল না। পুলিশ মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে অবৈধভাবে আমাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে সাধারণ এলাকাবাসী অপেশাদার পুলিশের হাত থেকে আমাকে মুক্ত করেছে। ওই পুলিশ সদস্য আগে ছাত্রলীগ নেতা ছিল এবং আওয়ামী আমলে মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।”

সার্বিক বিষয়ে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কঠোর ভাষায় বলেন, “পুলিশ সদস্যকে মারপিটের নিয়মিত মামলার এক নম্বর আসামি এই মোস্তফা কামাল মিন্টু। তাকে আইনানুযায়ী গ্রেফতারের সময় পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সরকারি কাজে বাধা ও আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশের পরবর্তী অভিযান জোরদার করা হয়েছে।”

মাইকে ঘোষণা দিয়ে পুলিশ পিটিয়ে বিএনপি নেতাকে ছিনতাই

আপডেট সময় : ০৯:০৬:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

যশোরের শার্শায় এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে জখম করার মামলার প্রধান আসামি ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করতে গিয়ে নজিরবিহীন মব (উত্তেজিত জনতা)-এর শিকার হয়েছে পুলিশ। গ্রেফতারের পর নাটকীয়ভাবে গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে কয়েকশত বাসিন্দা জড়ো করে পুলিশের হাত থেকে ওই বিএনপি নেতাকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিকেলে শার্শা উপজেলার শ্যামলাগাছি গ্রামে এই চাঞ্চল্যকর ও আইন অমান্যের ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

মসজিদের মাইকে ঘোষণা ও মব সৃষ্টি:

শুক্রবার (৫ জুন) দুপুরে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেনের নেতৃত্বে থানা ও ডিবি পুলিশের একটি যৌথ টিম শ্যামলাগাছি গ্রামে অভিযান চালায়। পুলিশ টিমটি গ্রামের একটি মোড় থেকে মামলার প্রধান আসামি বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টুকে গ্রেফতার করে।

ঠিক তখনই মিন্টুর সমর্থকরা কৌশল হিসেবে গ্রামের একাধিক মসজিদের মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দিতে শুরু করে যে, “মোস্তফা কামাল মিন্টুকে পুলিশ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে।” গ্রামবাসীকে দ্রুত প্রতিরোধের আহ্বান জানানো হলে মাইকের ঘোষণা শুনে মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশত ক্ষুব্ধ নারী-পুরুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে সেখানে ছুটে আসেন এবং পুলিশ সদস্যদের চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে মব সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে জনরোষের মুখে টিকতে না পেরে আসামিকে রেখেই ফিরে যেতে বাধ্য হয় যৌথ পুলিশ বাহিনী।

নেপথ্যে চাঁদা দাবি ও পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা:

মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, ট্যুরিস্ট পুলিশের হেডকোয়ার্টারে নায়েক পদে কর্মরত মামুন হাসান ওরফে জুয়েল নামের এক পুলিশ সদস্য কোরবানির ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি শ্যামলাগাছিতে এসেছিলেন। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর মামুন হাসানের বাবার ১৫ লাখ টাকার বালু বিক্রিতে বাধা দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি আসছিল আসামিরা। ঈদে বাড়িতে এসে মামুন হাসান বিষয়টি নিয়ে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের কাছে নালিশ করায় ক্ষিপ্ত হন মিন্টু ও তাঁর সহযোগীরা।

এরই জেরে গত ২৯ মে বিকেলে বাড়ি থেকে শার্শা বাজারে যাওয়ার পথে শ্যামলাগাছি গ্রামের একটি চায়ের দোকানের সামনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মামুন হাসানের গতিরোধ করে বেধড়ক পিটিয়ে জখম করা হয়। এ ঘটনায় তাঁর ছোট ভাই মেহেদী হাসান রয়েল বাদী হয়ে ৪ জুন শার্শা থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৫-৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রধান আসামি করা হয় মোস্তফা কামাল মিন্টুকে। অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মিন্টুর দুই ভাই লাল্টু ও পিন্টুসহ সুজন, সবুজ ও টিটন।

আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার, তালাবদ্ধ বাড়ি:

এদিকে এই ঘটনার পর চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পুলিশ সদস্যের পরিবার। আসামিদের অব্যাহত হুমকি-ধমকির মুখে পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। শুক্রবার ওই বাড়িতে গিয়ে প্রধান ফটকে তালা ঝুলতে দেখা যায়। ভেতর থেকে নিচু স্বরে কথা বলেন মামুনের ছোট চাচা সফিয়ার রহমান। তিনি বলেন, “আসামিরা আমাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ। আমরা সবাই আতঙ্কে আছি, কেউ বাড়িতে ঘুমাতে পারছি না।”

অভিযুক্তের দাবি ও পুলিশের অবস্থান:

অবশ্য মব সৃষ্টি করে পার পেয়ে যাওয়া বিএনপি নেতা মোস্তফা কামাল মিন্টু তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, “আমার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা বা ওয়ারেন্ট ছিল না। পুলিশ মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে অবৈধভাবে আমাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলে সাধারণ এলাকাবাসী অপেশাদার পুলিশের হাত থেকে আমাকে মুক্ত করেছে। ওই পুলিশ সদস্য আগে ছাত্রলীগ নেতা ছিল এবং আওয়ামী আমলে মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।”

সার্বিক বিষয়ে শার্শা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মারুফ হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে কঠোর ভাষায় বলেন, “পুলিশ সদস্যকে মারপিটের নিয়মিত মামলার এক নম্বর আসামি এই মোস্তফা কামাল মিন্টু। তাকে আইনানুযায়ী গ্রেফতারের সময় পরিকল্পিতভাবে মব সৃষ্টি করে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সরকারি কাজে বাধা ও আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। অপরাধীদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, আসামিকে গ্রেফতারে পুলিশের পরবর্তী অভিযান জোরদার করা হয়েছে।”