ঢাকা ০৯:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বরগুনা সদরে পরিবারতন্ত্রে বিপর্যস্ত বিএনপি, ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ

স্টাফ রিপোর্টার:
  • আপডেট সময় : ০৫:৩৪:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৫
  • / 228

৫ আগস্টের পরেও বরগুনা সদর উপজেলায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবিতে বরগুনায় মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। এখনও নিয়মিত পালন করা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কর্মসূচি, চলছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হটানোর লিফলেট বিতরণ এবং ঈদ উপহার কার্যক্রম। তবে বিএনপি এসব কার্যক্রম ঠেকাতে পারছে না। কারণ হিসেবে স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মোল্লা পরিবারের সম্পর্ককে দায়ী করছেন অনেকেই। যদিও এসব অভিযোগ মানতে নারাজ বিএনপির স্থানীয় নেতারা।


বিএনপির নিয়ন্ত্রণে মোল্লা পরিবার, কিন্তু নেই কার্যকর সংগঠন

বহুবছর ধরে বরগুনায় বিএনপির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে স্থানীয় মোল্লা পরিবারের হাতে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম মোল্লা, তার চাচাতো ভাই ফিরোজ উজ্জামান মামুন মোল্লা দলের কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক, মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা সাবেক সভাপতি ও সদ্য বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। কেন্দ্র কমিটি ভেঙে দেয় পদ বিক্রির অভিযোগে। জাহিদ মোল্লা জেলা যুবদলের সভাপতি, নাসিউদ্দিন মোল্লা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি এবং বাবুল মোল্লা কাঁঠালতলী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া ফারুক মোল্লার স্ত্রী আফরোজা বুলবুল ছিলেন জেলা মহিলা দলের সভাপতি।

এই পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ আছে যে, তারা দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে সুবিধা নিয়েছেন বেশি, দলকে সুসংগঠিত করেননি। এমনকি তাদের নিজ এলাকায়ও কখনো বিএনপি জয়ী হয়নি। বরং প্রতিবারই জিতেছে আওয়ামী লীগ।


এক পরিবারের দুই মেরু—বিএনপি ও আওয়ামী লীগ

মোল্লা পরিবারের শুধু বিএনপি নয়, রয়েছে আওয়ামী লীগে প্রভাবশালী অবস্থানও। নজরুল মোল্লার মেয়ের জামাই রাসেল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও যুবলীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপি নেতা শ্বশুরের নিরাপত্তাতেই ছিলেন তিনি, কোনো মামলাও হয়নি তার নামে। চাচাতো ভাই লাভলু মোল্লা কাঁঠালতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মামুন মোল্লার দুই খালাতো ভাই—মনিরুল ইসলাম মনির সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং তানভীর আহম্মেদ সিদ্দিকি জেলা যুবলীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মন্টু মোল্লার মামা মামুন মোল্লা। শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপে অংশ নিলেও মন্টুকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আসামি করা হয়নি, বরং একটি সাধারণ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ২-৩ দিনের মধ্যে মুক্তি পেয়েছেন। বর্তমানে বরগুনায় আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা হিসেবে রয়েছেন মন্টু মোল্লা ও তানভীর।


প্রথম মিছিল বরগুনায়, বিএনপি নীরব দর্শক

৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবিতে বরগুনাতেই প্রথম মিছিল হয়, গোপালগঞ্জ থেকেও আগে। ৮ আগস্ট কয়েকশ নেতা-কর্মী নিয়ে বরগুনা জেলা শহরে মিছিল ও সমাবেশ করে জেলা আওয়ামী লীগ। পুলিশ ও বিএনপি ছিল নিস্ক্রিয় দর্শক। ১২ আগস্ট শেখ হাসিনা ফোনে কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরের সঙ্গে। সেই ভিডিও ভাইরাল হলে ১৪ আগস্ট তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ তিন মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পান। এরপর ফের এক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে।

যদিও আদালত অঙ্গনের অনেকের মতে, পুলিশের দুর্বল মামলা ও প্রতিবেদনই তাকে সহজে জামিন পেতে সাহায্য করে।


কর্মসূচি অব্যাহত, প্রশাসন নিরব

ফেসবুক লাইভে ঈদ উপহার বিতরণ, শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্য কর্মসূচি—সবই চলছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে গান উৎসর্গ করে ফোনে ধন্যবাদ পেয়েছেন তালতলীর আওয়ামী লীগ নেতা ফোরকান ফরাজী। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রচার হয়েছে সরকারবিরোধী লিফলেট। এসব ঘটনায় বিএনপি নয়, পুলিশ প্রশাসনও প্রায় নিরব।

জেলা বিএনপির দাবি, নতুন পুলিশ সুপার ইব্রাহিম খলিল যোগদানের পর থেকেই আওয়ামী লীগবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মামলা করতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।


পুলিশ ও মোল্লা পরিবারের অবস্থান

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, “মামলা করতে এসে কেউ ফিরে গেছেন—এমন কোনো তথ্য জানা নেই। যা অভিযোগ আসছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন এবং বাকিদের ধরতেও অভিযান চলছে।

অন্যদিকে নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, “বরগুনায় বিএনপি মানেই তো মোল্লা পরিবার। ৫ আগস্টের আগে এখানে আর কেউ ছিল না। এখন কমিটি গঠনের লড়াইয়ে এসব অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে।” আত্মীয়স্বজনের আওয়ামী লীগে থাকা প্রসঙ্গে বলেন, “আমি তো তাদের বাধা দিতে পারি না। মেয়েও নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছি—এই অভিযোগ সত্য নয়। এগুলো নিছক অপপ্রচার।”

বরগুনা সদরে পরিবারতন্ত্রে বিপর্যস্ত বিএনপি, ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ

আপডেট সময় : ০৫:৩৪:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৫

৫ আগস্টের পরেও বরগুনা সদর উপজেলায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে আওয়ামী লীগ। ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর দাবিতে বরগুনায় মিছিল পর্যন্ত হয়েছে। এখনও নিয়মিত পালন করা হচ্ছে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কর্মসূচি, চলছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হটানোর লিফলেট বিতরণ এবং ঈদ উপহার কার্যক্রম। তবে বিএনপি এসব কার্যক্রম ঠেকাতে পারছে না। কারণ হিসেবে স্থানীয়ভাবে নেতৃত্বের ধারাবাহিক ব্যর্থতা এবং আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে মোল্লা পরিবারের সম্পর্ককে দায়ী করছেন অনেকেই। যদিও এসব অভিযোগ মানতে নারাজ বিএনপির স্থানীয় নেতারা।


বিএনপির নিয়ন্ত্রণে মোল্লা পরিবার, কিন্তু নেই কার্যকর সংগঠন

বহুবছর ধরে বরগুনায় বিএনপির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে স্থানীয় মোল্লা পরিবারের হাতে। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম মোল্লা, তার চাচাতো ভাই ফিরোজ উজ্জামান মামুন মোল্লা দলের কেন্দ্রীয় সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক, মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা সাবেক সভাপতি ও সদ্য বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। কেন্দ্র কমিটি ভেঙে দেয় পদ বিক্রির অভিযোগে। জাহিদ মোল্লা জেলা যুবদলের সভাপতি, নাসিউদ্দিন মোল্লা জেলা শ্রমিক দলের সভাপতি এবং বাবুল মোল্লা কাঁঠালতলী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া ফারুক মোল্লার স্ত্রী আফরোজা বুলবুল ছিলেন জেলা মহিলা দলের সভাপতি।

এই পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ আছে যে, তারা দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তি স্বার্থে সুবিধা নিয়েছেন বেশি, দলকে সুসংগঠিত করেননি। এমনকি তাদের নিজ এলাকায়ও কখনো বিএনপি জয়ী হয়নি। বরং প্রতিবারই জিতেছে আওয়ামী লীগ।


এক পরিবারের দুই মেরু—বিএনপি ও আওয়ামী লীগ

মোল্লা পরিবারের শুধু বিএনপি নয়, রয়েছে আওয়ামী লীগে প্রভাবশালী অবস্থানও। নজরুল মোল্লার মেয়ের জামাই রাসেল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও যুবলীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক। বিএনপি নেতা শ্বশুরের নিরাপত্তাতেই ছিলেন তিনি, কোনো মামলাও হয়নি তার নামে। চাচাতো ভাই লাভলু মোল্লা কাঁঠালতলী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। মামুন মোল্লার দুই খালাতো ভাই—মনিরুল ইসলাম মনির সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এবং তানভীর আহম্মেদ সিদ্দিকি জেলা যুবলীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক।

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মন্টু মোল্লার মামা মামুন মোল্লা। শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপে অংশ নিলেও মন্টুকে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলায় আসামি করা হয়নি, বরং একটি সাধারণ মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে ২-৩ দিনের মধ্যে মুক্তি পেয়েছেন। বর্তমানে বরগুনায় আওয়ামী লীগের সক্রিয় নেতা হিসেবে রয়েছেন মন্টু মোল্লা ও তানভীর।


প্রথম মিছিল বরগুনায়, বিএনপি নীরব দর্শক

৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনাকে ফেরানোর দাবিতে বরগুনাতেই প্রথম মিছিল হয়, গোপালগঞ্জ থেকেও আগে। ৮ আগস্ট কয়েকশ নেতা-কর্মী নিয়ে বরগুনা জেলা শহরে মিছিল ও সমাবেশ করে জেলা আওয়ামী লীগ। পুলিশ ও বিএনপি ছিল নিস্ক্রিয় দর্শক। ১২ আগস্ট শেখ হাসিনা ফোনে কথা বলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবিরের সঙ্গে। সেই ভিডিও ভাইরাল হলে ১৪ আগস্ট তাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতাসহ তিন মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই জামিনে মুক্তি পান। এরপর ফের এক মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় তাকে।

যদিও আদালত অঙ্গনের অনেকের মতে, পুলিশের দুর্বল মামলা ও প্রতিবেদনই তাকে সহজে জামিন পেতে সাহায্য করে।


কর্মসূচি অব্যাহত, প্রশাসন নিরব

ফেসবুক লাইভে ঈদ উপহার বিতরণ, শহীদ বেদিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ, নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্য কর্মসূচি—সবই চলছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীকে গান উৎসর্গ করে ফোনে ধন্যবাদ পেয়েছেন তালতলীর আওয়ামী লীগ নেতা ফোরকান ফরাজী। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে প্রচার হয়েছে সরকারবিরোধী লিফলেট। এসব ঘটনায় বিএনপি নয়, পুলিশ প্রশাসনও প্রায় নিরব।

জেলা বিএনপির দাবি, নতুন পুলিশ সুপার ইব্রাহিম খলিল যোগদানের পর থেকেই আওয়ামী লীগবিরোধী কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মামলা করতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে।


পুলিশ ও মোল্লা পরিবারের অবস্থান

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, “মামলা করতে এসে কেউ ফিরে গেছেন—এমন কোনো তথ্য জানা নেই। যা অভিযোগ আসছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন এবং বাকিদের ধরতেও অভিযান চলছে।

অন্যদিকে নজরুল ইসলাম মোল্লা বলেন, “বরগুনায় বিএনপি মানেই তো মোল্লা পরিবার। ৫ আগস্টের আগে এখানে আর কেউ ছিল না। এখন কমিটি গঠনের লড়াইয়ে এসব অপপ্রচার ছড়ানো হচ্ছে।” আত্মীয়স্বজনের আওয়ামী লীগে থাকা প্রসঙ্গে বলেন, “আমি তো তাদের বাধা দিতে পারি না। মেয়েও নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। তাদের নিরাপত্তা দিচ্ছি—এই অভিযোগ সত্য নয়। এগুলো নিছক অপপ্রচার।”