ঢাকা ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সিসা বার খুলতে নারকোটিক্সের ওপর ‘রাজনৈতিক চাপ’

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৪০:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 288

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর বেশ কয়েকটি অবৈধ সিসা বার পুনরায় চালু করতে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী মহলের অব্যাহত চাপে রীতিমতো ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ অবস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (নারকোটিক্স)। পট পরিবর্তনের পর এখন অনেক পুরোনো সিসা বার দখলদার আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোল পাল্টে বিএনপি নেতা সেজে তদবির চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অবৈধ সিসা বারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও কতিপয় অসাধু আইনজীবী, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং হলুদ সাংবাদিকদের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় এই ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী মালিক ও বর্তমান তদবির

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুলশান ও বনানী এলাকায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, এবং মেয়রদের আত্মীয়দের ছত্রছায়ায় বেশ কিছু সিসা বার পরিচালিত হতো।

বন্ধ হওয়া বারের মালিকরা:

সেলসিয়াস ও এক্সোটিক (বনানী): ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ছেলে আসিফ মোহাম্মদ নূর এর প্রতিষ্ঠান।

আল গিসিনো (বনানী): সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে রনি চৌধুরী।

কোর্ট ইয়ার্ড বাজার (গুলশান): ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়ে হিট অফিসার বুশরা আফরিন।

ফারেন হাইট: প্রভাবশালী শেখ পরিবারের সদস্য শেখ ফারিয়ার নামে পরিচালিত হতো।

সরকার পতনের পর পরই এঁরা সবাই গা ঢাকা দেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি এই বারগুলো খুলে দিতে প্রভাবশালীরা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন।

ভোল পাল্টে বিএনপি নেতা সেজে তদবির

অনেক অবৈধ সিসা বারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের নতুন পরিচয়ে হাজির হচ্ছেন:

শরিফ আল জাওয়াদ: সেলসিয়াস ও এক্সোটিক সিসা বার খুলে দিতে সম্প্রতি শরিফ আল জাওয়াদ নামে এক গাড়ি ব্যবসায়ী নারকোটিক্স কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিতে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তোলা সেলফি দেখান এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।

রফিক ফরাজি (হাভানা ক্যাফে): হাভানা ক্যাফে লাউঞ্জের মালিক রফিক ফরাজি আগে আওয়ামী লীগের শেল্টারে ব্যবসা চালালেও বর্তমানে ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপির পদধারী নেতা বলে পরিচয় দিচ্ছেন।

তানভির (সিগনেচার): সম্প্রতি অভিযানে বন্ধ হওয়া সিগনেচার সিসা বার খুলে দিতে তানভির নামের আরেক ব্যক্তি নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে তদবির করছেন।

তাছাড়াও, সরকারি কর্মকর্তা (মেহেদী), এক প্রভাবশালী সচিবের ছেলে, এক অতিরিক্ত সচিব এবং একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রভাবশালীরা সিসা বার খুলে দেওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

সিসা বারের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি ব্যবস্থা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সিসা বারের পরিবেশ ও সিসা সেবনের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

শারীরিক ক্ষতি: সিসায় ব্যবহৃত উপকরণে উচ্চমাত্রার নিকোটিন থাকে। সিসার মাত্র এক পাফে প্রায় ২০০ সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন দেহে প্রবেশ করে। এটি শ্বাসতন্ত্রের ক্যানসার, নারীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণে সমস্যা ও বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

নৈতিক অবক্ষয়: সিসা বারের অন্ধকার ও ছোট খুপরির পরিবেশ উঠতি বয়সিদের নৈতিকস্খলন ঘটাচ্ছে এবং ইয়াবা বা আইসের মতো ভয়ংকর নেশায় আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আইন: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সিসা সেবন ও বার পরিচালনার অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক একেএম শওকত ইসলাম জানান, যত প্রভাবশালীর তদবির আসুক না কেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কড়া নির্দেশ রয়েছে—অবৈধ সিসা বার কোনোভাবেই আর চালাতে দেওয়া হবে না। নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।

সিসা বার খুলতে নারকোটিক্সের ওপর ‘রাজনৈতিক চাপ’

আপডেট সময় : ১২:৪০:২৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৫

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীর বেশ কয়েকটি অবৈধ সিসা বার পুনরায় চালু করতে রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী মহলের অব্যাহত চাপে রীতিমতো ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ অবস্থা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (নারকোটিক্স)। পট পরিবর্তনের পর এখন অনেক পুরোনো সিসা বার দখলদার আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভোল পাল্টে বিএনপি নেতা সেজে তদবির চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

অবৈধ সিসা বারের বিরুদ্ধে কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও কতিপয় অসাধু আইনজীবী, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এবং হলুদ সাংবাদিকদের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় এই ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করা সম্ভব হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী মালিক ও বর্তমান তদবির

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুলশান ও বনানী এলাকায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, এবং মেয়রদের আত্মীয়দের ছত্রছায়ায় বেশ কিছু সিসা বার পরিচালিত হতো।

বন্ধ হওয়া বারের মালিকরা:

সেলসিয়াস ও এক্সোটিক (বনানী): ভারতে পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের ছেলে আসিফ মোহাম্মদ নূর এর প্রতিষ্ঠান।

আল গিসিনো (বনানী): সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার ছেলে রনি চৌধুরী।

কোর্ট ইয়ার্ড বাজার (গুলশান): ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলামের মেয়ে হিট অফিসার বুশরা আফরিন।

ফারেন হাইট: প্রভাবশালী শেখ পরিবারের সদস্য শেখ ফারিয়ার নামে পরিচালিত হতো।

সরকার পতনের পর পরই এঁরা সবাই গা ঢাকা দেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সম্প্রতি এই বারগুলো খুলে দিতে প্রভাবশালীরা নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করছেন।

ভোল পাল্টে বিএনপি নেতা সেজে তদবির

অনেক অবৈধ সিসা বারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের নতুন পরিচয়ে হাজির হচ্ছেন:

শরিফ আল জাওয়াদ: সেলসিয়াস ও এক্সোটিক সিসা বার খুলে দিতে সম্প্রতি শরিফ আল জাওয়াদ নামে এক গাড়ি ব্যবসায়ী নারকোটিক্স কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত করছেন। তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিতে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে তোলা সেলফি দেখান এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।

রফিক ফরাজি (হাভানা ক্যাফে): হাভানা ক্যাফে লাউঞ্জের মালিক রফিক ফরাজি আগে আওয়ামী লীগের শেল্টারে ব্যবসা চালালেও বর্তমানে ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপির পদধারী নেতা বলে পরিচয় দিচ্ছেন।

তানভির (সিগনেচার): সম্প্রতি অভিযানে বন্ধ হওয়া সিগনেচার সিসা বার খুলে দিতে তানভির নামের আরেক ব্যক্তি নিজেকে বিএনপি নেতা পরিচয় দিয়ে তদবির করছেন।

তাছাড়াও, সরকারি কর্মকর্তা (মেহেদী), এক প্রভাবশালী সচিবের ছেলে, এক অতিরিক্ত সচিব এবং একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মালিকসহ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রভাবশালীরা সিসা বার খুলে দেওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন।

সিসা বারের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি ব্যবস্থা

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সিসা বারের পরিবেশ ও সিসা সেবনের ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।

শারীরিক ক্ষতি: সিসায় ব্যবহৃত উপকরণে উচ্চমাত্রার নিকোটিন থাকে। সিসার মাত্র এক পাফে প্রায় ২০০ সিগারেটের সমপরিমাণ নিকোটিন দেহে প্রবেশ করে। এটি শ্বাসতন্ত্রের ক্যানসার, নারীর ক্ষেত্রে গর্ভধারণে সমস্যা ও বন্ধ্যত্ব সৃষ্টি করতে পারে।

নৈতিক অবক্ষয়: সিসা বারের অন্ধকার ও ছোট খুপরির পরিবেশ উঠতি বয়সিদের নৈতিকস্খলন ঘটাচ্ছে এবং ইয়াবা বা আইসের মতো ভয়ংকর নেশায় আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

আইন: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সিসা সেবন ও বার পরিচালনার অপরাধ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম এক থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক একেএম শওকত ইসলাম জানান, যত প্রভাবশালীর তদবির আসুক না কেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কড়া নির্দেশ রয়েছে—অবৈধ সিসা বার কোনোভাবেই আর চালাতে দেওয়া হবে না। নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।