ফরিদপুরে ফুটপাত চুরির মহোৎসব! হকারদের দখলে রাজপথ
- আপডেট সময় : ০৫:২৬:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
- / 74
শহরের ফুটপাত কার? উত্তরটা খুব সহজ—পথচারীদের নিরাপদ যাতায়াতের। কিন্তু ফরিদপুর পৌর এলাকার মানচিত্র উল্টে দেখলে মনে হবে, ফুটপাত যেন কোটিপতি ব্যবসায়ী আর ভাসমান হকারদের পৈতৃক সম্পত্তি! ফরিদপুর শহরের বুকে এখন চলছে প্রকাশ্য দিবালোকে ‘ফুটপাত চুরি’র এক কুৎসিত মহোৎসব। জনতা ব্যাংক মোড় থেকে শুরু করে রাজবাড়ী রাস্তার মোড়—কোথাও এক ইঞ্চি জায়গা ফাঁকা নেই। আর এই চরম অরাজকতার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফুটপাত থেকে বিতাড়িত হয়ে শিশু, শিক্ষার্থী ও বৃদ্ধরা প্রতিদিন যমের দুয়ারের মতো ব্যস্ত মূল সড়ক দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই নাগরিক যন্ত্রণা দূর করতে প্রশাসনের কোনো স্থায়ী চাবুক না থাকায় ফরিদপুরের সাধারণ নগরবাসীর পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখন আগ্নেয়গিরির মতো ফুঁসছে।
জনতা ব্যাংক মোড় থেকে গোয়ালচামট: ফুটপাত এখন হকারদের স্বর্গরাজ্য!
সম্প্রতি শহরের বিভিন্ন নার্ভ-সেন্টার ঘুরে যে হাড়হিম করা চিত্র দেখা গেল, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। জনতা ব্যাংক মোড়, হাজী শরীয়তুল্লাহ বাজার সংলগ্ন সড়ক, থানা মোড়, গোয়ালচামট, রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এবং টেপাখোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর ফুটপাত কার্যত হাপিশ হয়ে গেছে। কোথাও ফলের রাজত্ব, কোথাও ধোঁয়া ওঠা চায়ের স্টল, আবার কোথাও পোশাক, জুতো কিংবা সবজির অস্থায়ী বাজারের রমরমা কারবার।
মজার বিষয় হলো, বড় বড় নামী স্থায়ী দোকানের মালিকেরাও নিজেদের পণ্যের পসরা ফুটপাতে টেনে এনে সাজিয়ে রেখেছেন। ফলে পথচারীদের জন্য ফুটপাত এখন অলীক কল্পনা। আলিপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগই নেই। বাস, মোটরসাইকেল আর অটো রিকশার চাকার নিচ দিয়ে আমাদের যুদ্ধ করে হাঁটতে হয়। বাচ্চাদের নিয়ে বের হলে কলিজা শুকিয়ে যায়।” রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্রী তানিয়া আক্তারও জানালেন একই আশঙ্কার কথা—“কলেজে যাওয়ার সময় মনে হয় কোনো রেসলিং রিংয়ে নেমেছি, গাড়ির গা ঘেঁষে হাঁটতে গিয়ে রোজ দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হয়।”
পুনর্বাসনের দাবি বনাম প্রশাসনের চোর-পুলিশ খেলা
ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় রিকশাচালক আব্দুল কাদেরের মতো সাধারণ চালকেরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রাস্তায় মানুষ হাঁটায় গাড়ির গতি কমে গিয়ে শহর জুড়ে তৈরি হচ্ছে নরকগুলজার যানজট। এদিকে, অভিযুক্ত ফুটপাতে বসা ব্যবসায়ীদের দাবি—জীবিকার তাগিদেই তারা এখানে বসছেন, বিকল্প কোনো জায়গা নেই।
কিন্তু এই ‘জীবিকার দোহাই’ দিয়ে লাখো মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কতখানি যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান। তিনি বলেন, “নিয়মিত মনিটরিং ও চাবুক-মার্কা কঠোর অভিযান না থাকায় দখলদারেরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। প্রশাসন উচ্ছেদ করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সব আবার আগের মতো হয়ে যায়।” ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সভাপতি আবরাব নাদিম ইতু একসুরে জানিয়েছেন, স্রেফ উচ্ছেদ নাটকে কাজ হবে না। হকারদের জন্য দ্রুত বিকল্প স্থান বা হলিডে মার্কেট তৈরি করতে হবে এবং একই সাথে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ফৌজদারি আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
নড়েচড়ে বসল পৌর কর্তৃপক্ষ, সমন্বিত অভিযানের ডাক
পৌরবাসীর এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার পর অবশেষে ঘুম ভাঙার ইঙ্গিত দিয়েছে পৌর প্রশাসন। ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা নিয়মিত উচ্ছেদ করি, কিন্তু চোর-পুলিশ খেলার মতো তারা আবার বসে পড়ে। তবে এবার আমরা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। খুব শিগগিরই জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি বড় ধরনের সমন্বিত ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। একই সাথে ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য স্থায়ী বিকল্প ব্যবস্থার বিষয়টিও আমাদের বিবেচনায় রয়েছে।”




















