ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রতি ৪টি টুথপেস্টের ৩টিতেই মিলল বিষ

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১০:৫৮:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬
  • / 140

দিন শুরুর প্রথম আলো ফুটতেই বাঙালির যে চিরচেনা অভ্যাস—মুখ ধুয়ে দাঁত মাজা, তাতেই ওত পেতে বসে আছে এক অদৃশ্য ঘাতক! সাদা ফেনার আড়ালে প্রতিদিন সকালে অজান্তেই আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক। আমরা ভাবছি দাঁত সাফ হচ্ছে, অথচ আমাদের অজান্তেই রক্তের শিরায় ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিকের কণা। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)-এর এক হাড়হিম করা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে প্রায় তিনটিতেই (৭৬.৫ শতাংশ) মিলেছে এই ক্ষতিকর কণা। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়, বাদ যায়নি শিশুদের জন্য তৈরি চটকদার টুথপেস্টও!

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এই উপাদানের কথা পণ্যের মোড়কে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হচ্ছে। এই ভয়াবহ তথ্য সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে দেশের মাননিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই।

গবেষণাগারে মিলল প্লাস্টিকের সংসার: শিশুদের পণ্যেও হানা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’ ল্যাবরেটরিতে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও এফটিআইআর প্রযুক্তির চাবুক দিয়ে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে চক্ষু চড়কগাছ গবেষকদের! ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণার চাবুক আরও বলছে, শিশুদের জন্য বাজারে থাকা ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬.৭ শতাংশ) বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকদের আন্তর্জাতিক তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভিয়েতনামের ২টির মধ্যে দুটিতেই, আর ভারতের ৫টির মধ্যে ১টি ও থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এই কৃত্রিম পলিমার শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ এক বছর ধরে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর এই জরিপ চালানো হয়।

ফুসফুস থেকে হৃদরোগ: এনামেল ক্ষয়ের নেপথ্যে প্লাস্টিক

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে ঢুকে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস করছে, জন্ম দিচ্ছে অ্যাজমা ও সিওপিডি-র মতো মারাত্মক রোগের। এখানেই শেষ নয়, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে আইবিএস এবং রক্তনালীর ক্ষতি করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এই কণা। এমনকি মানুষের চিন্তাশক্তি হ্রাস ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করার পেছনেও রয়েছে এর হাত।

দন্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার জোরে দাঁত সাময়িক সাদা করতে পারলেও, তা আসলে দাঁতের এনামেলের ওপর অত্যন্ত বিরূপ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।”

অথচ এই বিষাক্ত উপাদানের কথা মোড়কের লেবেলে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ৪১.৯ শতাংশ ভোক্তাই জানেন না যে টুথপেস্টে প্লাস্টিক থাকতে পারে!

বিএসটিআই-এর হুঁশিয়ারি ও নীতিনির্ধারণের তাগিদ

এমন পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। সংস্থার উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল করিম স্বীকার করেন, টুথপেস্ট তৈরির অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের তালিকায় এত দিন মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে এই গবেষণার পর দ্রুত এসআরও (SRO) সংশোধন করে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা নির্ধারণের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ এবং মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন একসুরে জানিয়েছেন, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক লড়াই। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে দায়ী করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়; বরং জাতীয় মানদণ্ড ও লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে ভোক্তাদের জীবন বাঁচানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য।

প্রতি ৪টি টুথপেস্টের ৩টিতেই মিলল বিষ

আপডেট সময় : ১০:৫৮:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

দিন শুরুর প্রথম আলো ফুটতেই বাঙালির যে চিরচেনা অভ্যাস—মুখ ধুয়ে দাঁত মাজা, তাতেই ওত পেতে বসে আছে এক অদৃশ্য ঘাতক! সাদা ফেনার আড়ালে প্রতিদিন সকালে অজান্তেই আমাদের শরীরে প্রবেশ করছে বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক। আমরা ভাবছি দাঁত সাফ হচ্ছে, অথচ আমাদের অজান্তেই রক্তের শিরায় ঢুকে পড়ছে প্লাস্টিকের কণা। বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো)-এর এক হাড়হিম করা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেশে বিক্রি হওয়া প্রতি চারটি টুথপেস্টের মধ্যে প্রায় তিনটিতেই (৭৬.৫ শতাংশ) মিলেছে এই ক্ষতিকর কণা। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয়, বাদ যায়নি শিশুদের জন্য তৈরি চটকদার টুথপেস্টও!

পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এই উপাদানের কথা পণ্যের মোড়কে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হচ্ছে। এই ভয়াবহ তথ্য সামনে আসতেই নড়েচড়ে বসেছে দেশের মাননিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই।

গবেষণাগারে মিলল প্লাস্টিকের সংসার: শিশুদের পণ্যেও হানা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের ‘এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি’ ল্যাবরেটরিতে স্টিরিওমাইক্রোস্কোপি ও এফটিআইআর প্রযুক্তির চাবুক দিয়ে ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে চক্ষু চড়কগাছ গবেষকদের! ৩৪টি নমুনার মধ্যে ২৬টিতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণার চাবুক আরও বলছে, শিশুদের জন্য বাজারে থাকা ৬টি টুথপেস্টের মধ্যে ৪টিতেই (৬৬.৭ শতাংশ) বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকদের আন্তর্জাতিক তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ২৫টি নমুনার মধ্যে ২২টিতে, ভিয়েতনামের ২টির মধ্যে দুটিতেই, আর ভারতের ৫টির মধ্যে ১টি ও থাইল্যান্ডের ২টির মধ্যে ১টিতে এই কৃত্রিম পলিমার শনাক্ত হয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত দীর্ঘ এক বছর ধরে ২ হাজার ৭৬০ জন ভোক্তার ওপর এই জরিপ চালানো হয়।

ফুসফুস থেকে হৃদরোগ: এনামেল ক্ষয়ের নেপথ্যে প্লাস্টিক

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে ঢুকে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস করছে, জন্ম দিচ্ছে অ্যাজমা ও সিওপিডি-র মতো মারাত্মক রোগের। এখানেই শেষ নয়, অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে আইবিএস এবং রক্তনালীর ক্ষতি করে স্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে এই কণা। এমনকি মানুষের চিন্তাশক্তি হ্রাস ও হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করার পেছনেও রয়েছে এর হাত।

দন্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. মোশাররফ হোসেন খন্দকার কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেন, “মাইক্রোপ্লাস্টিক তার ঘর্ষণ ক্ষমতার জোরে দাঁত সাময়িক সাদা করতে পারলেও, তা আসলে দাঁতের এনামেলের ওপর অত্যন্ত বিরূপ ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।”

অথচ এই বিষাক্ত উপাদানের কথা মোড়কের লেবেলে সম্পূর্ণ চেপে যাওয়া হচ্ছে। জরিপে দেখা গেছে, ৪১.৯ শতাংশ ভোক্তাই জানেন না যে টুথপেস্টে প্লাস্টিক থাকতে পারে!

বিএসটিআই-এর হুঁশিয়ারি ও নীতিনির্ধারণের তাগিদ

এমন পরিস্থিতিতে মুখ খুলেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। সংস্থার উপ-পরিচালক মো. মনজুরুল করিম স্বীকার করেন, টুথপেস্ট তৈরির অনুমোদিত ৪০টি উপাদানের তালিকায় এত দিন মাইক্রোপ্লাস্টিক অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে এই গবেষণার পর দ্রুত এসআরও (SRO) সংশোধন করে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সর্বোচ্চ সহনশীল মাত্রা নির্ধারণের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মারঘুব মোর্শেদ এবং মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন একসুরে জানিয়েছেন, দেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক লড়াই। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডকে দায়ী করা তাঁদের উদ্দেশ্য নয়; বরং জাতীয় মানদণ্ড ও লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা তৈরি করে ভোক্তাদের জীবন বাঁচানোই তাঁদের মূল লক্ষ্য।