ঢাকা ০৩:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুবদল নেতা নিখোঁজ ৬ দিন: সেতুর নিচে মিলল তার মোটরসাইকেল

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৮:১৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫
  • / 465

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় যুবদলের এক নেতা রফিকুল ইসলাম ওরফে শামিম (৩৬) গত ৬ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত শনিবার (৫ জুলাই, ২০২৫) রাতে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল স্থানীয় গইচাসিয়া সেতুর নিচে পানি থেকে উদ্ধার করা হলেও, রফিকুল ইসলামের সন্ধান মেলেনি। পরিবারের দাবি, প্রতিপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতার আতঙ্কে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন এবং তাকে গুম করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা চরম উদ্বিগ্ন।

নিখোঁজের কারণ ও পারিবারিক অভিযোগ

নিখোঁজ রফিকুল ইসলাম গণ্ডা ইউনিয়নের মনকান্দা গ্রামের বাসিন্দা আক্কাস মিয়ার ছেলে। তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (২ জুলাই, ২০২৫) রাত সাড়ে ১২টার দিকে রফিকুল ইসলাম বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ নেই। পরিবারের ভাষ্য, প্রতিপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান মেলেনি, পুলিশও তাকে গ্রেফতার করেনি।

রফিকুলের স্ত্রী নাজমা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মাদ্রাসার বিরোধ নিয়া গ্রামে দুইডা পক্ষ হইছে। এ নিয়া হামলা-মামলা চলতাছে। গত পাঁচ দিন ধইরা আমার স্বামীর কোনো খোঁজ নাই। তার মোটরসাইকেল ব্রিজের নিচে পাওয়া গেছে। প্রতিপক্ষ সপ্তাহখানেক আগে বাড়িত আইয়া অস্ত্রের মহড়া দিয়া কইয়া গেছে আমার স্বামীরে আর জীবিত রাখতো না। তারে গুম কইরালবো। আমি আমার স্বামীরে ফেরত চাই।”

রফিকুলের বাবা আক্কাস মিয়া অভিযোগ করেন, তার ছেলে নিখোঁজের আগের দিন প্রতিপক্ষ মোস্তফার লোকজন তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে টাকা-পয়সা কেড়ে নেয় এবং হত্যার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার ছেলেকে প্রতিপক্ষরা গুম করেছে।

মাদ্রাসার বিরোধ ও সংঘর্ষ

স্থানীয় বাসিন্দা, থানা-পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, মনকান্দা এমইউ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এএমএন মহিবুল্লাহ এবং সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলামসহ অন্য শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষ বিদ্যমান। দুর্নীতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তর গত বছরের ৪ অক্টোবর অধ্যক্ষকে সরিয়ে সাইফুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তবে এএমএন মহিবুল্লাহ উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে গত ২৪ মার্চ থেকে তিনি আবারও অধ্যক্ষের দায়িত্ব ফিরে পান। এই দুই শিক্ষকের বিরোধের জেরেই গ্রামে দুটি শক্তিশালী পক্ষ তৈরি হয়।

যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম অধ্যক্ষ মহিবুল্লাহর পক্ষে ছিলেন, আর সাইফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন মোস্তফা কামাল। রফিকুল ও মোস্তফা দুজনেই প্রতিবেশী এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের এই বিরোধের জেরে গত ৮ জুন দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ কয়েকজন আহত হন। ওই ঘটনায় দুইপক্ষের বিরুদ্ধেই মামলা হয়।

গত ১৪ জুন মোস্তফা কামাল বাদী হয়ে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে ১৬ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এর জবাবে, ২০ জুন রফিকুলের চাচা ওয়ালী উল্লাহ বাদী হয়ে মোস্তফা কামালকে প্রধান করে ৯ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। রফিকুলের পরিবারের অভিযোগ, এই মামলাগুলোর কারণেই রফিকুল, তার দুই ভাই ও চাচাসহ অন্যান্য আসামিরা আত্মগোপনে ছিলেন।

পুলিশের তৎপরতা

গত বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই, ২০২৫) রফিকুলের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। শনিবার (৫ জুলাই, ২০২৫) রাতে রফিকুলের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি স্থানীয় মাইজহাটি-আঠারোবাড়ি সড়কের গইচাসিয়া সেতুর নিচ থেকে পানি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে রফিকুল ইসলামের সন্ধান এখনো মেলেনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোস্তফা কামালের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার বসতঘর তালাবদ্ধ দেখা গেছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, রফিকুল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মোস্তফা কামাল ও তার লোকজন বাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছেন।

কেন্দুয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, নিখোঁজ রফিকুল ইসলামের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।

যুবদল নেতা নিখোঁজ ৬ দিন: সেতুর নিচে মিলল তার মোটরসাইকেল

আপডেট সময় : ০৮:১৭:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৭ জুলাই ২০২৫

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলায় যুবদলের এক নেতা রফিকুল ইসলাম ওরফে শামিম (৩৬) গত ৬ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর গত শনিবার (৫ জুলাই, ২০২৫) রাতে তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেল স্থানীয় গইচাসিয়া সেতুর নিচে পানি থেকে উদ্ধার করা হলেও, রফিকুল ইসলামের সন্ধান মেলেনি। পরিবারের দাবি, প্রতিপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতার আতঙ্কে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন এবং তাকে গুম করা হয়েছে বলে তাদের ধারণা। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা চরম উদ্বিগ্ন।

নিখোঁজের কারণ ও পারিবারিক অভিযোগ

নিখোঁজ রফিকুল ইসলাম গণ্ডা ইউনিয়নের মনকান্দা গ্রামের বাসিন্দা আক্কাস মিয়ার ছেলে। তিনি ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং বর্তমানে ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (২ জুলাই, ২০২৫) রাত সাড়ে ১২টার দিকে রফিকুল ইসলাম বাড়ি থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। এরপর থেকেই তার কোনো খোঁজ নেই। পরিবারের ভাষ্য, প্রতিপক্ষের করা মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে খোঁজ নিয়েও তার কোনো সন্ধান মেলেনি, পুলিশও তাকে গ্রেফতার করেনি।

রফিকুলের স্ত্রী নাজমা আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “মাদ্রাসার বিরোধ নিয়া গ্রামে দুইডা পক্ষ হইছে। এ নিয়া হামলা-মামলা চলতাছে। গত পাঁচ দিন ধইরা আমার স্বামীর কোনো খোঁজ নাই। তার মোটরসাইকেল ব্রিজের নিচে পাওয়া গেছে। প্রতিপক্ষ সপ্তাহখানেক আগে বাড়িত আইয়া অস্ত্রের মহড়া দিয়া কইয়া গেছে আমার স্বামীরে আর জীবিত রাখতো না। তারে গুম কইরালবো। আমি আমার স্বামীরে ফেরত চাই।”

রফিকুলের বাবা আক্কাস মিয়া অভিযোগ করেন, তার ছেলে নিখোঁজের আগের দিন প্রতিপক্ষ মোস্তফার লোকজন তাকে তুলে নিয়ে মারধর করে টাকা-পয়সা কেড়ে নেয় এবং হত্যার চেষ্টা করে। পরে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার ছেলেকে প্রতিপক্ষরা গুম করেছে।

মাদ্রাসার বিরোধ ও সংঘর্ষ

স্থানীয় বাসিন্দা, থানা-পুলিশ ও পারিবারিক সূত্র জানায়, মনকান্দা এমইউ আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এএমএন মহিবুল্লাহ এবং সহকারী অধ্যাপক সাইফুল ইসলামসহ অন্য শিক্ষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দুটি পক্ষ বিদ্যমান। দুর্নীতির অভিযোগে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তর গত বছরের ৪ অক্টোবর অধ্যক্ষকে সরিয়ে সাইফুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তবে এএমএন মহিবুল্লাহ উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে গত ২৪ মার্চ থেকে তিনি আবারও অধ্যক্ষের দায়িত্ব ফিরে পান। এই দুই শিক্ষকের বিরোধের জেরেই গ্রামে দুটি শক্তিশালী পক্ষ তৈরি হয়।

যুবদল নেতা রফিকুল ইসলাম অধ্যক্ষ মহিবুল্লাহর পক্ষে ছিলেন, আর সাইফুল ইসলামের পক্ষে ছিলেন মোস্তফা কামাল। রফিকুল ও মোস্তফা দুজনেই প্রতিবেশী এবং বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের এই বিরোধের জেরে গত ৮ জুন দুইপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে উভয়পক্ষের বাড়ি-ঘর ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ কয়েকজন আহত হন। ওই ঘটনায় দুইপক্ষের বিরুদ্ধেই মামলা হয়।

গত ১৪ জুন মোস্তফা কামাল বাদী হয়ে রফিকুল ইসলামকে প্রধান করে ১৬ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এর জবাবে, ২০ জুন রফিকুলের চাচা ওয়ালী উল্লাহ বাদী হয়ে মোস্তফা কামালকে প্রধান করে ৯ জনের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। রফিকুলের পরিবারের অভিযোগ, এই মামলাগুলোর কারণেই রফিকুল, তার দুই ভাই ও চাচাসহ অন্যান্য আসামিরা আত্মগোপনে ছিলেন।

পুলিশের তৎপরতা

গত বৃহস্পতিবার (৩ জুলাই, ২০২৫) রফিকুলের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। শনিবার (৫ জুলাই, ২০২৫) রাতে রফিকুলের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি স্থানীয় মাইজহাটি-আঠারোবাড়ি সড়কের গইচাসিয়া সেতুর নিচ থেকে পানি থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে রফিকুল ইসলামের সন্ধান এখনো মেলেনি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মোস্তফা কামালের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি এবং তার বসতঘর তালাবদ্ধ দেখা গেছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, রফিকুল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মোস্তফা কামাল ও তার লোকজন বাড়ি ছেড়ে পলাতক রয়েছেন।

কেন্দুয়া থানার ওসি মিজানুর রহমান জানান, নিখোঁজ রফিকুল ইসলামের মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়েছে এবং তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। তিনি বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।