নদী ছেড়ে ফরিদপুরে বেদেদের ঠাঁই, জীবিকা এখন ‘হয়রানিমূলক ভিক্ষা
- আপডেট সময় : ১০:৪৭:৩৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ অক্টোবর ২০২৫
- / 304
পল্লীকবি জসিমউদ্দীনের কবিতায় বা পুরোনো চলচ্চিত্রে দেখা বেদে সম্প্রদায়ের নৌকায় ভেসে বেড়ানো ও সাপ খেলা দেখিয়ে জীবিকা নির্বাহের চিরায়ত চিত্র এখন আর নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই যাযাবর সম্প্রদায়টি নদী ছেড়ে এখন ফরিদপুরের মুন্সিবাজার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ীভাবে জমিতে বসতি স্থাপন করেছে। তবে স্থায়ী জমি বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তাদের পেশা বদলে যাওয়ায়, জীবিকার তাগিদে এই সম্প্রদায়ের নারীরা এখন ‘হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তির’ আশ্রয় নিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে।
ফরিদপুরের মুন্সিবাজার এলাকায় প্রায় ৫৫টি ঝুপড়িতে ৮০টি বেদে পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
বদলে যাওয়া জীবন ও হয়রানিমূলক ভিক্ষাবৃত্তি
ঐতিহ্যবাহী পেশা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেদে সম্প্রদায়ের পুরুষ সদস্যরা এখন প্রায় বেকার। অন্যদিকে, নারীরা শিশুদের নিয়ে শহরের পথে পথে এক ভিন্ন ধরনের ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছেন।
হয়রানির অভিযোগ: বেদে নারীরা সরাসরি হাত না পেতে পথচারীদের ঘিরে ধরে টাকা কেড়ে নেওয়ার ভঙ্গি করে বা হয়রানি করে টাকা আদায় করেন। বায়তুল আমানের বাসিন্দা শামীম রানা অভিযোগ করেন, জনতা ব্যাংকের মোড়ে রিকশা থেকে নামলেই শিশুরা তাঁকে ঘিরে ফেলে টাকা কেড়ে নিতে চায়, ফলে বাধ্য হয়েই ৫০ টাকা দিতে হয়।
সামাজিক অবক্ষয়: সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের একজন শিক্ষার্থী এই পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানিয়েছেন। স্থানীয়রা এই সামাজিক অবক্ষয়ের প্রধান কারণ হিসেবে শিক্ষার অভাবকে দায়ী করছেন।
বঞ্চনা ও মৌলিক অধিকারের অভাব
মুন্সিবাজারে বসবাসকারী প্রায় ৩০০ বেদে মানুষ চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য ও জন্ম নিবন্ধন: বেদে কিশোর সজীব জানায়, সে পোলিও টিকা পায়নি এবং তার জন্ম নিবন্ধনও নেই। তার শরীরে টিকা না পাওয়ার লক্ষণ বিদ্যমান।
আক্ষেপ: বেদে পল্লীর সর্দারের বউ লাভলী আক্ষেপ করে বলেন, “ভিক্ষা করা তো ভালা না, কিন্তু পেটের দায়ে করি; অভাবে স্বভাব নষ্ট।” তিনি সরকারের কাছে তাদের স্থায়ী ঘরবাড়ি দেওয়ার দাবি জানান, যাতে তারা সন্তানদের পড়ালেখা করাতে পারে।
পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও প্রশাসন
এই করুণ পরিস্থিতিতে বেদে সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়িয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
শিক্ষার আলো: সংগঠনটি মুন্সিবাজার এলাকায় ‘প্রজন্মের আলো’ নামে একটি স্কুল স্থাপন করেছে, যেখানে সপ্তাহে তিন দিন বেদে শিশুদের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি জাহিদ ইসলাম আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষার মাধ্যমেই শিশুরা ভিক্ষাবৃত্তি থেকে মুক্তি পাবে।
ইউএনও’র আশ্বাস: ফরিদপুর সদর উপজেলার ইউএনও ইসরাত জাহান স্বীকার করেছেন, জন্ম নিবন্ধন না থাকায় বেদে সম্প্রদায় সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দেন যে বেদে সম্প্রদায়ের সদস্যরা জন্ম নিবন্ধন ও নাগরিকত্ব পেতে আগ্রহী হলে প্রশাসন তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে।











