ঢাকা ০৪:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুর: ‘মেজর আসিফ’-ই কি এসআই রবিউল? মুক্তিপণ হাতবদলের রহস্য

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:২৪:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
  • / 478

ফরিদপুরের নগরকান্দা থানায় আটক এক যুবকের পরিবারকে ‘মেজর আসিফ’ নামের এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভয় দেখিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নগরকান্দা থানার উপপরিদর্শক এসআই রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি জানিয়েছে, মামলা ও বিপদের ভয় দেখিয়ে দুটি বিকাশ নম্বরে এই টাকা নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী যুবক ইমদাদুল শেখ (২৭) লস্করদিয়া ইউনিয়নের শশা গ্রামের দরিদ্র কৃষক ইকতার শেখের সন্তান। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

ফাঁদে আটক ও ‘মেজর আতঙ্ক’

ঘটনার সূত্রপাত: ইমদাদুল শেখ প্রতিবেশী জিসান মাতুব্বরের কাছে ২,৫০০ টাকা পেতেন। গত শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) জিসান তাঁকে জানান, তালমা মোড়ের একটি বিকাশ দোকানে গেলে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে, যার মধ্যে পাওনা রেখে বাকিটা পরিবারকে পৌঁছে দিতে হবে।

আটক: বিকাশ দোকানে পৌঁছানোর পরই বিপত্তি ঘটে। দোকানদার মিন্টু খন্দকার জানান, একজন নিজেকে ‘মেজর’ পরিচয় দিয়ে ফোন করে ইমদাদুলকে আটক করার নির্দেশ দেন। দোকানদার ভয় পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশে খবর দিলে এসআই রবিউল ইসলাম এসে ইমদাদুলকে মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনসহ থানায় নিয়ে যান।

অপরাধের প্রমাণ নেই: প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো অপরাধের প্রমাণ না মেলায় ইমদাদুলকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হলেও, এরপরই শুরু হয় প্রতারণার নাটক।

এসআই রবিউলের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, এসআই রবিউল ইসলাম গোলঘরে ইমদাদুলের মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন জিম্মি রেখে পুরো নাটকটি সাজান:

‘মেজর আসিফ’: এসআই রবিউল পরিবারকে বলেন, “বিষয়টা এখন আমার হাতে নেই, মেজর আসিফ নামের একজন এটি দেখছেন।”

টাকার দাবি: রবিউল নিজেই তাঁর ফোন থেকে ইমদাদুলের পরিবারের সঙ্গে ‘মেজর আসিফ’র কথা বলিয়ে দেন। ওই ব্যক্তি ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য সরাসরি ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন।

হুমকি: রবিউল দুইটি বিকাশ নম্বর দেন এবং দ্রুত টাকা পাঠাতে তাগাদা দিয়ে বলেন, “টাকা পাঠাতে দেরি করলে মামলা হবে, এখনই পাঠান।”

টাকা প্রেরণ: আতঙ্কে পড়ে পরিবারটি নগরকান্দা বাজারের একটি দোকান থেকে দুটি বিকাশ নম্বরে তড়িঘড়ি করে ৬০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেয়।

টাকা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর ইমদাদুল ও তাঁর মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে মোবাইল ফোনটি এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীর পরিবার যা বলছেন

ইমদাদুল শেখ অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী জিসান তাঁকে ফাঁদে ফেলে জাল টাকার ব্যবসায়ী বলে মিথ্যা অপবাদ দেয় এবং পরে পুলিশে দেয়।

ইমদাদুলের মা শিল্পী বেগম বলেন, “আমার ছেলেকে জিসান ফাঁদে ফেলেছে। থানায় নিয়ে গিয়ে রবিউল স্যার নানা মামলা দেওয়ার ভয় দেখান। আমরা ভয়ে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছি। এখন তারা মুখ না খোলার হুমকি দিচ্ছে।”

ইকতার শেখ জানান, এসআই রবিউলের ভয়েই তাঁরা দুটি নম্বরে ৬০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।

পুলিশ ও অভিযুক্তের বক্তব্য

এসআই রবিউল ইসলামের অস্বীকার: অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই রবিউল ইসলাম বলেন, তিনি শুধু জাল টাকার অভিযোগের ভিত্তিতে ইমদাদুলকে থানায় নিয়ে যান। পরে কোনো সত্যতা না পাওয়ায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেন। ‘মেজর পরিচয়ে টাকার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। টাকা নেওয়ার বিষয়টি এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক নয়।’

ওসি’র বক্তব্য: নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বলেন, “জাল টাকার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছিল, কিন্তু সত্যতা না পাওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকার লেনদেনের বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রতিবেশী নিখোঁজ: অভিযুক্ত প্রতিবেশী জিসান মাতুব্বরকে বাড়িতে কিংবা মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুর: ‘মেজর আসিফ’-ই কি এসআই রবিউল? মুক্তিপণ হাতবদলের রহস্য

আপডেট সময় : ০১:২৪:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

ফরিদপুরের নগরকান্দা থানায় আটক এক যুবকের পরিবারকে ‘মেজর আসিফ’ নামের এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভয় দেখিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে নগরকান্দা থানার উপপরিদর্শক এসআই রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি জানিয়েছে, মামলা ও বিপদের ভয় দেখিয়ে দুটি বিকাশ নম্বরে এই টাকা নেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী যুবক ইমদাদুল শেখ (২৭) লস্করদিয়া ইউনিয়নের শশা গ্রামের দরিদ্র কৃষক ইকতার শেখের সন্তান। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।

ফাঁদে আটক ও ‘মেজর আতঙ্ক’

ঘটনার সূত্রপাত: ইমদাদুল শেখ প্রতিবেশী জিসান মাতুব্বরের কাছে ২,৫০০ টাকা পেতেন। গত শুক্রবার (২৪ অক্টোবর) জিসান তাঁকে জানান, তালমা মোড়ের একটি বিকাশ দোকানে গেলে ২০ হাজার টাকা দেওয়া হবে, যার মধ্যে পাওনা রেখে বাকিটা পরিবারকে পৌঁছে দিতে হবে।

আটক: বিকাশ দোকানে পৌঁছানোর পরই বিপত্তি ঘটে। দোকানদার মিন্টু খন্দকার জানান, একজন নিজেকে ‘মেজর’ পরিচয় দিয়ে ফোন করে ইমদাদুলকে আটক করার নির্দেশ দেন। দোকানদার ভয় পেয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশে খবর দিলে এসআই রবিউল ইসলাম এসে ইমদাদুলকে মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোনসহ থানায় নিয়ে যান।

অপরাধের প্রমাণ নেই: প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদে কোনো অপরাধের প্রমাণ না মেলায় ইমদাদুলকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হলেও, এরপরই শুরু হয় প্রতারণার নাটক।

এসআই রবিউলের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ

ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, এসআই রবিউল ইসলাম গোলঘরে ইমদাদুলের মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন জিম্মি রেখে পুরো নাটকটি সাজান:

‘মেজর আসিফ’: এসআই রবিউল পরিবারকে বলেন, “বিষয়টা এখন আমার হাতে নেই, মেজর আসিফ নামের একজন এটি দেখছেন।”

টাকার দাবি: রবিউল নিজেই তাঁর ফোন থেকে ইমদাদুলের পরিবারের সঙ্গে ‘মেজর আসিফ’র কথা বলিয়ে দেন। ওই ব্যক্তি ছেলেকে ছাড়ানোর জন্য সরাসরি ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন।

হুমকি: রবিউল দুইটি বিকাশ নম্বর দেন এবং দ্রুত টাকা পাঠাতে তাগাদা দিয়ে বলেন, “টাকা পাঠাতে দেরি করলে মামলা হবে, এখনই পাঠান।”

টাকা প্রেরণ: আতঙ্কে পড়ে পরিবারটি নগরকান্দা বাজারের একটি দোকান থেকে দুটি বিকাশ নম্বরে তড়িঘড়ি করে ৬০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেয়।

টাকা পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পর ইমদাদুল ও তাঁর মোটরসাইকেল ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে মোবাইল ফোনটি এখনো ফেরত দেওয়া হয়নি।

ভুক্তভোগীর পরিবার যা বলছেন

ইমদাদুল শেখ অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী জিসান তাঁকে ফাঁদে ফেলে জাল টাকার ব্যবসায়ী বলে মিথ্যা অপবাদ দেয় এবং পরে পুলিশে দেয়।

ইমদাদুলের মা শিল্পী বেগম বলেন, “আমার ছেলেকে জিসান ফাঁদে ফেলেছে। থানায় নিয়ে গিয়ে রবিউল স্যার নানা মামলা দেওয়ার ভয় দেখান। আমরা ভয়ে বিকাশে টাকা পাঠিয়েছি। এখন তারা মুখ না খোলার হুমকি দিচ্ছে।”

ইকতার শেখ জানান, এসআই রবিউলের ভয়েই তাঁরা দুটি নম্বরে ৬০ হাজার টাকা পাঠিয়েছেন।

পুলিশ ও অভিযুক্তের বক্তব্য

এসআই রবিউল ইসলামের অস্বীকার: অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে এসআই রবিউল ইসলাম বলেন, তিনি শুধু জাল টাকার অভিযোগের ভিত্তিতে ইমদাদুলকে থানায় নিয়ে যান। পরে কোনো সত্যতা না পাওয়ায় পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেন। ‘মেজর পরিচয়ে টাকার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। টাকা নেওয়ার বিষয়টি এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সঠিক নয়।’

ওসি’র বক্তব্য: নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল করিম বলেন, “জাল টাকার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছিল, কিন্তু সত্যতা না পাওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। টাকার লেনদেনের বিষয়ে এখনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রতিবেশী নিখোঁজ: অভিযুক্ত প্রতিবেশী জিসান মাতুব্বরকে বাড়িতে কিংবা মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।