ঢাকা ০৪:০৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ৬ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আনু মোস্তফা, রাজশাহী

ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ফরিদপুরসহ পদ্মাপাড়ের ১২ জেলায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৫:২৩:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৫
  • / 395

মরণবাঁধ ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে পদ্মা অববাহিকায় ১২টি জেলার ৩৮টি উপজেলা এলাকায় বছর বছর নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে। পদ্মা তীরবর্তী ও সংলগ্ন গ্রাম-জনপদে বসবাসকারী প্রায় আড়াই কোটি মানুষ আকস্মিক বন্যা ও বাৎসরিক নদীভাঙনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

৫০ বছরে কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর প্রায় ৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে ফারাক্কার প্রভাবে ভাটিতে বাংলাদেশের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকায় পদ্মার দুই তীর ও চরাঞ্চলের কোটি মানুষ নদীভাঙন ও বন্যায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বসতভিটা বাঁচাতে গিয়ে মানুষ বারবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

জমিজিরাত বালুর আস্তরণে ঢাকা

ভাঙনে হারানো সহায়-সম্বল ও জমিজিরাত এখন পদ্মার বুকে বালুর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো নিজ জন্মস্থান ছেড়ে অচেনা জনপদে ঠাঁই নিয়েছে। এক সময়ের সামর্থ্যবান কৃষক ও গৃহস্থরা আজ দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। নদীভাঙন ঠেকাতে রাষ্ট্রকেও প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে ফারাক্কার পর

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে পদ্মা অববাহিকায় নদীভাঙন থাকলেও এত তীব্র ছিল না। এখন পদ্মা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। নদীর স্বাভাবিক নিয়মে পলিমাটির চর জাগার পরিবর্তে এখন কোটি কোটি টন বালু এসে পড়ছে, ফলে পদ্মার তলদেশ ভরাট হয়ে নদীটি সরু ও মরুভূমির মতো হয়ে গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীভাঙনের ভয়াবহতা

ফারাক্কার ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের বোগলাউড়ি, লক্ষ্মীপুর ও বাবপুর গ্রাম ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব গ্রামের মানুষ এখন সহায়-সম্বলহীন।

বোগলাউড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “এক দশক আগেও জমিজমা ছিল, এখন দিনমজুরি করছি।”

পাঁকার বিশরশিয়া, নামোজগন্নাথপুর, দোভাগী, ঘুঘুডাঙ্গা, মনোহরপুর, হাসেনপুর, কানছিড়া, উজিরপুর এলাকার শত শত পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বেড়িবাঁধের নিচে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব জীবনের গল্প

উজিরপুর বালুঘাট এলাকার বাসিন্দা হাসান আলী জানান, “পদ্মার ভেতর ছিল উজিরপুর ও রাধাকান্তপুর। আজ সেসব গ্রাম পদ্মায় বিলীন। আমরা অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছি।” বর্তমানে আবার ভাঙনের আশঙ্কায় আতঙ্কিত এসব পরিবার।

পদ্মার উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ের গ্রামগুলো হুমকিতে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুর্লভপুর, মনাকষা, জোহরপুর, নারায়ণপুর, দক্ষিণ পাঁকা, আলাতুলি, চরবাগডাঙ্গা, দেবিনগর, শাজাহানপুরের ৩০ কিলোমিটারব্যাপী পদ্মার তীরবর্তী এলাকাগুলোতে অব্যাহত রয়েছে নদীভাঙন। বিশেষ করে উত্তর পাড়ের লোকজন দক্ষিণের চরে গিয়ে বসতি গড়লেও এখন সেসব চরও ভাঙছে।

পাউবোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, “ফারাক্কার নিকটবর্তী পদ্মার ৬৫ কিলোমিটার অংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।” ফারাক্কার দক্ষিণ ও উত্তর লকগেট খুলে দেয়ার ফলে নদীর দুই পাড়েই চাপ পড়ে এবং নদীভাঙন বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, “ফারাক্কার কারণে পদ্মার বুক বালুর আস্তরণে ভরাট হয়েছে। ফলে পানি ধারণক্ষমতা ৮০ ভাগ কমে গেছে। বর্ষায় বিশাল জলরাশি আসলে নদীর দুই পাড় উপচে পড়ে এবং আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন ঘটে।”

ভাটির বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলেও তীব্র ভাঙন

ফারাক্কার প্রভাবে রাজশাহী, নাটোর ছাড়াও কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পর্যন্ত অঞ্চলে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, অবকাঠামো হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত নদী তীরবর্তী জনগণ

পদ্মা অববাহিকায় নদীভাঙনের ফলে শুধু সহায়-সম্বল হারানোই নয়, আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে মানুষ দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে। গবেষণা বলছে, আগে পদ্মা পলিমাটি বয়ে এনে উর্বরতা দিতো। এখন আসে কেবল বালু। এতে কৃষি উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব তৈরি হয়েছে।

আর্থিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। পদ্মার ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, আমবাগান ও রাস্তাঘাট। নদীপারের মানুষেরা ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছেন।

আনু মোস্তফা, রাজশাহী

ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে ফরিদপুরসহ পদ্মাপাড়ের ১২ জেলায় নদীভাঙন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে

আপডেট সময় : ০৫:২৩:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৫

মরণবাঁধ ফারাক্কার ধ্বংসাত্মক প্রভাবে পদ্মা অববাহিকায় ১২টি জেলার ৩৮টি উপজেলা এলাকায় বছর বছর নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে। পদ্মা তীরবর্তী ও সংলগ্ন গ্রাম-জনপদে বসবাসকারী প্রায় আড়াই কোটি মানুষ আকস্মিক বন্যা ও বাৎসরিক নদীভাঙনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

৫০ বছরে কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত

১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর প্রায় ৫০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এই সময়ে ফারাক্কার প্রভাবে ভাটিতে বাংলাদেশের প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকায় পদ্মার দুই তীর ও চরাঞ্চলের কোটি মানুষ নদীভাঙন ও বন্যায় বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বসতভিটা বাঁচাতে গিয়ে মানুষ বারবার স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

জমিজিরাত বালুর আস্তরণে ঢাকা

ভাঙনে হারানো সহায়-সম্বল ও জমিজিরাত এখন পদ্মার বুকে বালুর আস্তরণে ঢাকা পড়ে আছে। বাস্তুচ্যুত মানুষগুলো নিজ জন্মস্থান ছেড়ে অচেনা জনপদে ঠাঁই নিয়েছে। এক সময়ের সামর্থ্যবান কৃষক ও গৃহস্থরা আজ দিনমজুরে পরিণত হয়েছেন। নদীভাঙন ঠেকাতে রাষ্ট্রকেও প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে ফারাক্কার পর

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে পদ্মা অববাহিকায় নদীভাঙন থাকলেও এত তীব্র ছিল না। এখন পদ্মা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে। নদীর স্বাভাবিক নিয়মে পলিমাটির চর জাগার পরিবর্তে এখন কোটি কোটি টন বালু এসে পড়ছে, ফলে পদ্মার তলদেশ ভরাট হয়ে নদীটি সরু ও মরুভূমির মতো হয়ে গেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদীভাঙনের ভয়াবহতা

ফারাক্কার ১৮ কিলোমিটার ভাটিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের বোগলাউড়ি, লক্ষ্মীপুর ও বাবপুর গ্রাম ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এসব গ্রামের মানুষ এখন সহায়-সম্বলহীন।

বোগলাউড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, “এক দশক আগেও জমিজমা ছিল, এখন দিনমজুরি করছি।”

পাঁকার বিশরশিয়া, নামোজগন্নাথপুর, দোভাগী, ঘুঘুডাঙ্গা, মনোহরপুর, হাসেনপুর, কানছিড়া, উজিরপুর এলাকার শত শত পরিবার নদীভাঙনের শিকার হয়ে বেড়িবাঁধের নিচে গাদাগাদি করে বসবাস করছেন।

জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব জীবনের গল্প

উজিরপুর বালুঘাট এলাকার বাসিন্দা হাসান আলী জানান, “পদ্মার ভেতর ছিল উজিরপুর ও রাধাকান্তপুর। আজ সেসব গ্রাম পদ্মায় বিলীন। আমরা অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে বসবাস করছি।” বর্তমানে আবার ভাঙনের আশঙ্কায় আতঙ্কিত এসব পরিবার।

পদ্মার উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ের গ্রামগুলো হুমকিতে

চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুর্লভপুর, মনাকষা, জোহরপুর, নারায়ণপুর, দক্ষিণ পাঁকা, আলাতুলি, চরবাগডাঙ্গা, দেবিনগর, শাজাহানপুরের ৩০ কিলোমিটারব্যাপী পদ্মার তীরবর্তী এলাকাগুলোতে অব্যাহত রয়েছে নদীভাঙন। বিশেষ করে উত্তর পাড়ের লোকজন দক্ষিণের চরে গিয়ে বসতি গড়লেও এখন সেসব চরও ভাঙছে।

পাউবোর পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এসএম আহসান হাবীব জানান, “ফারাক্কার নিকটবর্তী পদ্মার ৬৫ কিলোমিটার অংশ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে।” ফারাক্কার দক্ষিণ ও উত্তর লকগেট খুলে দেয়ার ফলে নদীর দুই পাড়েই চাপ পড়ে এবং নদীভাঙন বাড়ে।

তিনি আরও বলেন, “ফারাক্কার কারণে পদ্মার বুক বালুর আস্তরণে ভরাট হয়েছে। ফলে পানি ধারণক্ষমতা ৮০ ভাগ কমে গেছে। বর্ষায় বিশাল জলরাশি আসলে নদীর দুই পাড় উপচে পড়ে এবং আকস্মিক বন্যা ও নদীভাঙন ঘটে।”

ভাটির বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলেও তীব্র ভাঙন

ফারাক্কার প্রভাবে রাজশাহী, নাটোর ছাড়াও কুষ্টিয়া, পাবনা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পর্যন্ত অঞ্চলে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, অবকাঠামো হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

দারিদ্র্যের দিকে ধাবিত নদী তীরবর্তী জনগণ

পদ্মা অববাহিকায় নদীভাঙনের ফলে শুধু সহায়-সম্বল হারানোই নয়, আর্থিক সক্ষমতা হারিয়ে মানুষ দিন দিন দরিদ্র হচ্ছে। গবেষণা বলছে, আগে পদ্মা পলিমাটি বয়ে এনে উর্বরতা দিতো। এখন আসে কেবল বালু। এতে কৃষি উৎপাদন কমে গিয়ে খাদ্য সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাব তৈরি হয়েছে।

আর্থিক ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী জানান, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ফারাক্কার কারণে বাংলাদেশের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে সোয়া লাখ কোটি টাকা। বর্তমানে বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। পদ্মার ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ, আমবাগান ও রাস্তাঘাট। নদীপারের মানুষেরা ক্রমাগত নিঃস্ব হয়ে অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছেন।