ঢাকা ০৭:০৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজনীতির তীর্থস্থান ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিল: দেড়শ বছরের ইতিহাস, যেখানে এসেছিলেন নেতাজি-নজরুল-রবীন্দ্রনাথ

রাজনীতির তীর্থস্থান ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৯:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫
  • / 505

প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী, ফরিদপুরের কমলাপুরের ময়েজ মঞ্জিল জমিদার বাড়ি আজও উপমহাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক নীরব কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৮৪ সালে জমিদার চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের হাতে নির্মিত এই সুবিশাল প্রাসাদ একসময় ছিল খ্যাতিমান রাজনীতিক ও সাহিত্যিকদের মিলনমেলা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এমন বহু কিংবদন্তী এই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন।

বর্তমানেও এই বাড়িটি কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

ময়েজ মঞ্জিলের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী

নির্মাণ ব্যয় ও সময়: জমিদার চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাস ৩০ বিঘা জমির ওপর ১১ লাখ রুপি (তৎকালীন) ব্যয়ে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন।

নকশা ও উপকরণ: ময়েজউদ্দিন নিজেই বাড়ির নকশা করেন এবং মার্টিন কোম্পানিকে নির্মাণের দায়িত্ব দেন। বাড়ি তৈরির সব ইস্পাতের ভিম আনা হয়েছিল যুক্তরাজ্য থেকে।

আয়তন: মূল ভবনের আয়তন প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট এবং এতে ৪০টি কক্ষ রয়েছে। ১৯১৬ সালে এটি সংস্কার করা হয়।

আকর্ষণ: ভবনটি উজ্জ্বল সাদা রঙের, যেখানে রয়েছে মনোরম ফুল ও ফলের বাগান। ভবনের পশ্চিম-উত্তর পাশে অবস্থিত ময়েজ মঞ্জিল জামে মসজিদ এবং চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের কবর।

উপমহাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

ব্রিটিশ ভারতে এই ময়েজ মঞ্জিল ছিল বহু ঐতিহাসিক সমাবেশের সাক্ষী।

গুরুত্বপূর্ণ সভা: এখানে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি, অল ইন্ডিয়া লিটারেটি কনফারেন্স, অল ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস কনফারেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্স ও ফেয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কিংবদন্তীদের পদচারণা: ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এই বাড়িতে এসেছিলেন:

রাজনীতিক: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, চিত্তরঞ্জন দাস, খাজা নাজিম উদ্দিন, স্যার মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান, এমনকি পাকিস্তানের কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীও।

সাহিত্যিক ও শিল্পী: কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, মহাত্মা গান্ধী, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন, অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুর প্রমুখ।

বর্তমান রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধি

এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি থেকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি পরিচালনা করেছেন জমিদার ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের নাতি চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। তিনি ছিলেন বিএনপির একাধিকবারের মন্ত্রী ও ভাইস চেয়ারম্যান।

বর্তমান নেতৃত্ব: বর্তমানে তাঁর মেয়ে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এই বাড়ি থেকেই তাঁর সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশা: তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর সদর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এ বাড়িতে থেকেই আমার পূর্বপুরুষরা রাজনীতি করে গেছেন… আমি তাঁর (বাবার) আদর্শে রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে রয়েছি।”

ইতিহাস জানতে আসা দর্শনার্থী এবং ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন করে নিজেদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন।

রাজনীতির তীর্থস্থান ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিল: দেড়শ বছরের ইতিহাস, যেখানে এসেছিলেন নেতাজি-নজরুল-রবীন্দ্রনাথ

রাজনীতির তীর্থস্থান ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিল

আপডেট সময় : ০৮:৩৯:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ অক্টোবর ২০২৫

প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো ইতিহাসের সাক্ষী, ফরিদপুরের কমলাপুরের ময়েজ মঞ্জিল জমিদার বাড়ি আজও উপমহাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির এক নীরব কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৮৪ সালে জমিদার চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের হাতে নির্মিত এই সুবিশাল প্রাসাদ একসময় ছিল খ্যাতিমান রাজনীতিক ও সাহিত্যিকদের মিলনমেলা। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর—এমন বহু কিংবদন্তী এই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন করেছেন।

বর্তমানেও এই বাড়িটি কেন্দ্র করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। এটি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন অসংখ্য দর্শনার্থী।

ময়েজ মঞ্জিলের স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী

নির্মাণ ব্যয় ও সময়: জমিদার চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাস ৩০ বিঘা জমির ওপর ১১ লাখ রুপি (তৎকালীন) ব্যয়ে এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন।

নকশা ও উপকরণ: ময়েজউদ্দিন নিজেই বাড়ির নকশা করেন এবং মার্টিন কোম্পানিকে নির্মাণের দায়িত্ব দেন। বাড়ি তৈরির সব ইস্পাতের ভিম আনা হয়েছিল যুক্তরাজ্য থেকে।

আয়তন: মূল ভবনের আয়তন প্রায় ৩০ হাজার বর্গফুট এবং এতে ৪০টি কক্ষ রয়েছে। ১৯১৬ সালে এটি সংস্কার করা হয়।

আকর্ষণ: ভবনটি উজ্জ্বল সাদা রঙের, যেখানে রয়েছে মনোরম ফুল ও ফলের বাগান। ভবনের পশ্চিম-উত্তর পাশে অবস্থিত ময়েজ মঞ্জিল জামে মসজিদ এবং চৌধুরী ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের কবর।

উপমহাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু

ব্রিটিশ ভারতে এই ময়েজ মঞ্জিল ছিল বহু ঐতিহাসিক সমাবেশের সাক্ষী।

গুরুত্বপূর্ণ সভা: এখানে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ, অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটি, অল ইন্ডিয়া লিটারেটি কনফারেন্স, অল ইন্ডিয়া মোশন পিকচারস কনফারেন্সসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কনফারেন্স ও ফেয়ার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

কিংবদন্তীদের পদচারণা: ১৯৩০ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে এই বাড়িতে এসেছিলেন:

রাজনীতিক: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, চিত্তরঞ্জন দাস, খাজা নাজিম উদ্দিন, স্যার মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ খান, এমনকি পাকিস্তানের কয়েকজন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীও।

সাহিত্যিক ও শিল্পী: কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরোজিনী নাইডু, মহাত্মা গান্ধী, প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন, অভিনেতা পৃথ্বীরাজ কাপুর প্রমুখ।

বর্তমান রাজনীতি ও জনপ্রতিনিধি

এই ঐতিহ্যবাহী বাড়িটি থেকে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি পরিচালনা করেছেন জমিদার ময়েজউদ্দিন বিশ্বাসের নাতি চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ। তিনি ছিলেন বিএনপির একাধিকবারের মন্ত্রী ও ভাইস চেয়ারম্যান।

বর্তমান নেতৃত্ব: বর্তমানে তাঁর মেয়ে চৌধুরী নায়াব ইউসুফ এই বাড়ি থেকেই তাঁর সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।

মনোনয়ন প্রত্যাশা: তিনি আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর সদর আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে যুগান্তরকে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এ বাড়িতে থেকেই আমার পূর্বপুরুষরা রাজনীতি করে গেছেন… আমি তাঁর (বাবার) আদর্শে রাজনীতির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে রয়েছি।”

ইতিহাস জানতে আসা দর্শনার্থী এবং ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরাও এই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন করে নিজেদের মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন।