ফরিদপুরে কৃষক-যুবদল নেতার বিরুদ্ধে দোকান দখলের ভয়ঙ্কর অভিযোগ!
- আপডেট সময় : ১২:২৬:১৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ জুন ২০২৫
- / 711
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকা চিতারবাজারে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। বিদেশফেরত কাপড় ব্যবসায়ী আমিন বিশ্বাসের মালিকানাধীন দুটি দোকান ঘর তালাবদ্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের বিরুদ্ধে। এর প্রতিবাদ করায় তার বাড়িতে ভাঙচুর ও মালামাল চুরির ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে প্রাণভয়ে পরিবার নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এই ব্যবসায়ী।
আমিন বিশ্বাসের অভিযোগ, তার দোকানপাট জোরপূর্বক দখলে নিতে তার বিরুদ্ধে হত্যা, বিস্ফোরক আইন ও মারামারির অসংখ্য মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে নিঃশেষ করে গ্রামছাড়া করার পাঁয়তারা চলছে।
দীর্ঘ প্রবাসজীবনের পর নতুন জীবন, নতুন বিপদ
জানা গেছে, বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামের আমীন বিশ্বাস (৪৭) দীর্ঘ ২৩ বছর সৌদি আরবে কাটিয়ে ৬ বছর আগে দেশে ফিরে আসেন। দেশে এসে তিনি চিতারবাজারে দেড় শতক জমি কিনে দুটি দোকানঘর তৈরি করে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। তবে, ওই জমি নিয়ে তার সঙ্গে জমির অপর এক শরিক পক্ষের সঙ্গে বিরোধ চলছিল।
আমিন বিশ্বাস জানান, প্রায় চার মাস আগে উপজেলা কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক ও দাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সলিমুল হক তার দোকানের ভাড়াটিয়াদের হুমকি-ধামকি দিয়ে তাকে বাদ দিয়ে তাদের কাছে ভাড়া দিতে বলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রেজাউল হক ও সলিমুল হক সম্পর্কে আপন দুই ভাই। তাদের দাবি, আমিন বিশ্বাসের কেনা ওই দোকানের জমির সম্পত্তিতে তাদের ওয়ারিশ সূত্রে মালিকানা রয়েছে। এই অবস্থায়, সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভাড়াটিয়ারা দোকানের ভাড়ার টাকা কোনো পক্ষকে না দিয়ে চিতারবাজার বণিক সমিতির নেতাদের কাছে জমা দিতে শুরু করেন।
পুলিশি হস্তক্ষেপেও সমাধান অধরা
এ বিষয়ে আমিন বিশ্বাস বোয়ালমারী থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। গত ১৭ মে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদুল হাসানের হস্তক্ষেপে দোকানের ভাড়ার টাকা ও চাবি আমিন বিশ্বাসকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এর কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রতিপক্ষ আবারও ওই দোকানে তালা ঝুলিয়ে দেয়। সেই রাতেই আমিন বিশ্বাসের বাড়ির পানির মোটর ও সিসি ক্যামেরা চুরি হয়ে যায়।
মিথ্যা মামলার জালে বন্দী
আমিন বিশ্বাস জানান, ওই দোকানের জমি কেনার ‘অপরাধেই’ এসব করা হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়েরকৃত চারটি হত্যা মামলা এবং ছয়টি বিস্ফোরক মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৯ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পরই তাকে কুপিয়ে পায়ের রগ কেটে দেওয়া হয়েছিল। সেই জখমের যন্ত্রণা তিনি আজও বয়ে বেড়াচ্ছেন। এর মধ্যেই গত ১০ মাসে অসংখ্য মামলার আসামি হয়ে তিনি এখন দিশেহারা। বর্তমানে ভয়ংকর সব অপরাধে তার বিরুদ্ধে ১৬টি মামলা বিচারাধীন।
কান্নাজড়িত কন্ঠে আমিন বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেন, “বিভিন্ন সময়ে বাড়িতে পুলিশ আসে তদন্তে। তাদের মাধ্যমে জেনেছি শাহবাগ, যাত্রাবাড়ি ও বাড্ডা থানাসহ বিভিন্ন থানায় আমার নামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ৪টি হত্যা মামলা ও ৬টি বিস্ফোরক আইনে মামলা হয়েছে। এসব মামলার বাদীকে আমি চিনিও না। আমি কোনোদিন সংগঠন করি নাই। অথচ আমাকে আওয়ামী লীগের দোসর বলে ওরা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। গত ১০ মাস আমি বাড়িতে ঘুমাতে পারি না। আমার কতো টাকা যে চলে গেছে তা আমিই জানি। এরা আমাকে শেষ করে ফেলেছে। আমার একটাই অপরাধ-আমি কেন এই জমি কিনলাম?” তার স্ত্রী রিক্তা বেগম বলেন, “আমার একটি ছোট মেয়ে আছে। তার সামনেই আমাদের গালিগালাজ করে ভয়ভীতি দেখায়। নিজেদের দোকান থাকতেও আমার স্বামী অন্যের দোকান ভাড়া নিয়ে ব্যবসা করছেন।”
অভিযুক্তদের বক্তব্য ও স্থানীয়দের মতামত
এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল হক দাবি করেন, “আমিন বিশ্বাস ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বিয়ে করেছেন। আওয়ামী লীগের আমলে প্রভাব খাটিয়ে আমাদের শরিকানা জমি দখল করে দোকানঘর পাকা করেছেন। অনেক ক্ষমতা খাটিয়েছে। আমরা জমি নিয়ে বাটোয়ারা মামলা করেছি। ওই দোকান আমাদের। এজন্য ভাড়াটিয়াকে বলেছি, ভাড়ার টাকা আমাদের কাছে দিতে।” তবে সাম্প্রতিক সময়ে আমিন বিশ্বাসের নামে বিভিন্ন মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এসব মিথ্যা বলে দাবি করেন এবং এসব বিষয়ে জানেন না বলে জানান।
দাদপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সলিমুল হক বলেন, “আমিন বিশ্বাসের ওপর হামলার বিষয়ে আমরা কিছু জানতাম না। আমাদেরকে ওই মামলায় মিথ্যাভাবে আসামি করা হয়েছে।”
তবে স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আমিন বিশ্বাস নিরীহ প্রকৃতির লোক এবং তিনি কখনোই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
চিতারবাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. শাকিল মোল্যা বলেন, “আমিন বিশ্বাস আওয়ামী লীগের কোনো পদ-পদবিতে ছিলেন না এবং কখনও শালিস দরবার বা কোনো দলের সভা-সমাবেশেও দেখিনি। উনি মূলত নিরীহ ও সহজ-সরল প্রকৃতির মানুষ।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও আমিন বিশ্বাসের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন।
চিতারবাজারের এক জুতা ব্যবসায়ী জানান, “ওই জমিটা অনেক শরিকদারের। এর মধ্যে রেজাউলদের টাকাপয়সা বেশি। এখন ওই জমি আমিন বিশ্বাস কিনল কেন এটাই মূল কারণ।” আরেকজন ব্যবসায়ী যোগ করেন, “ওই জমির সামনের অংশের দাম বেশি। যেখানে আমিন বিশ্বাস জমি কিনে দোকান ঘর তুলেছেন। এখন ওই জমির জন্য এতসব হচ্ছে।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিরোধীয় ওই দোকানের পাশের মালিকানা জমির সঙ্গে হালটের জমির অংশ জুড়ে আরো চার-পাঁচটি দোকান ঘর তোলা হয়েছে মূল রাস্তার পাশে দিয়ে। ওই দোকানগুলোর ভাড়াও রেজাউল হক তুলেছেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
চিতারবাজার বণিক বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি জামালউদ্দিন বলেন, “ওই জমি নিয়ে অনেক আগে থেকেই কিছু ঝামেলা চলছিল। তবে এবার এই সমস্যা দু’একদিনে সমাধান হবে না বিধায় সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দোকানের ভাড়া বাজারের কমিটির কাছে জমা রাখতে বলি। পরে জমি যে পাবে তাকে ফিরিয়ে দেব। তবে এরমাঝে বোয়ালমারী থানার ওসি আমাকে ফোন করে জানান যে, বিষয়টি এখন থানার এখতিয়ারে। এরপর সেদিন দোকান ভাড়ার জমা দুই মাসের টাকা আমিন বিশ্বাসকে ফিরিয়ে দেই। এরপর আবার ঝামেলা হয়েছে। এখন বিএনপি নেতা সাবেক এমপি খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ২৮ জুন বসে সমাধান করবেন বলে জানিয়েছেন।”
দলীয় পরিচয় নিশ্চিত করে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মিনহাজুল রহমান লিপন ও কৃষক দলের সভাপতি লুৎফর রহমান জানান, তারা বিষয়টি নিয়ে অবগত নন এবং অভিযোগ পেলে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় তদন্তানুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বোয়ালমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদুল হাসান বলেন, “দোকান ঘরের বিষয়ে আমিন বিশ্বাসের অভিযোগ পেয়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে উভয়পক্ষ সম্মত না হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনা করে সুরাহা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।” আর আমিন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত বিভিন্ন মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “অন্য কোনো থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। ওই থানা থেকে আসা নির্দেশনা অনুযায়ী আমিন বিশ্বাসের নাম-ঠিকানার তথ্য জানার জন্য পুলিশ তার বাড়িতে গিয়েছিল।”





















