শিবিরকর্মী ছেলে আন্দোলনে, বিএনপি নেতা বহিষ্কার!
- আপডেট সময় : ০৮:৩৮:৩৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
- / 103
বাপের অপরাধে ছেলের সাজা পাওয়ার মধ্যযুগীয় উপাখ্যান আমরা বহু শুনেছি। কিন্তু ছেলের রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা রাজপথের প্রতিবাদের ‘পাপ’-এ খোদ জন্মদাতাকে দল থেকে ছুড়ে ফেলার এমন নজিরবিহীন ঘটনা আধুনিক রাজনীতিতে সত্যিই বিরল! বগুড়ার বাতাসে এখন সেই নির্মম রাজনৈতিক প্রহসনেরই গন্ধ। ছেলের ছাত্র শিবির প্রীতি আর পরীক্ষার্থীদের রাজপথের আন্দোলনে শামিল হওয়াই যেন কাল হলো পিতা ফারুক হোসেনের। ২২ বছরের ত্যাগী, হামলা-মামলা জরাজীর্ণ এক প্রবীণ বিএনপি নেতাকে কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই এক নিমেষে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত জানাল বগুড়া মহানগর বিএনপি।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) রাতে এক তড়িঘড়ি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ফারুক হোসেনকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সমস্ত পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই ফারুক হোসেন জেলা বিএনপির নির্বাহী সদস্য, মহানগর বিএনপির তথ্য সম্পাদক ও ৯নং ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। কিন্তু মুহূর্তের এক ঝড়ে তাঁর এত বছরের রাজনৈতিক সমর্পণ ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হলো।
রাজপথে ছেলের গর্জন, ঘরে পিতার গর্দান!
এই নাটকীয়তার সূত্রপাত মঙ্গলবার দুপুর থেকে। ফারুক হোসেনের ছেলে সিফাত হোসেন (১৮) বগুড়া সরকারি শাহ্ সুলতান কলেজের এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এবং একই সঙ্গে তিনি ইসলামী ছাত্র শিবিরের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। চলমান দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে মঙ্গলবার দুপুরে বগুড়ার সাতমাথা এলাকায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের যে তীব্র সড়ক অবরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাতে অংশ নিয়েছিলেন সিফাত। সেখানে পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের তীব্র বাগবিতণ্ডাও হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজপথে নামতে হয় জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আজগর তালুকদার হেনা এবং বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এমআর ইসলাম স্বাধীনসহ সিনিয়র নেতাদের। কিন্তু আন্দোলনের আগুন সাতমাথায় নিভলেও, তার তপ্ত ছাই গিয়ে পড়ে সিফাতের বাবার ঘাড়ে। এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জেলা ও মহানগরীর শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে তড়িঘড়ি করে ফারুক হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করেন মহানগর বিএনপির সভাপতি হামিদুল হক চৌধুরী হিরু ও সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি।
২২ বছরের সাজা বনাম ‘ভোটের গদি’ কাড়ার চক্রান্ত
এই নজিরবিহীন বহিষ্কারাদেশের পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন ফারুক হোসেন। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, “ছেলে বড় হয়েছে, সে কোন দল করবে বা কোন আন্দোলনে যাবে তা কি বাবা চব্বিশ ঘণ্টা পাহারা দেবে? গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে হত্যা মামলাসহ আট-আটটি মামলা কাঁধে নিয়ে লড়লাম, আর আজ ছেলের কারণে দল আমাকে এভাবে তাড়িয়ে দিল?”
ফারুকের ইঙ্গিত অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিস্ফোরক। তিনি দাবি করেন, জেলা ও মহানগরের বহু বড় বড় নেতার নিজের ঘরের মানুষ আওয়ামী লীগ কিংবা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তবে কোপটা কেবল তাঁর ওপরেই কেন? আসলে ফারুক হোসেন আগামী বগুড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৯নং ওয়ার্ডের অত্যন্ত জনপ্রিয় কাউন্সিলর প্রার্থী। দলের ভেতরেই থাকা তাঁর প্রতিপক্ষরা এই আসন্ন নির্বাচনে তাঁকে মাঠ থেকে সরাতেই ‘ছেলের শিবির প্রীতি’কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই চক্রান্তের নীলনকশা সাজিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক বিএনপি নেতাও স্বীকার করেছেন, আসলে ৯নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদের গদিটি কাড়তেই ফারুকের ডানা এভাবে কেটে দেওয়া হলো।





















