ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কাগজে ১৭৮, মাঠে ৫০! ফরিদপুরে নদী খননে ‘ভূতুড়ে শ্রমিক’ নামিয়ে লুঠপাট

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:০০:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
  • / 88

সরকারি টাকা মানেই কি তবে হরিলুট? নদী খননের নামে খালের জল ঘোলা করে লাখ লাখ টাকা পকেটে পোরার এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত জালিয়াতির সাক্ষী থাকল ফরিদপুরের চরভদ্রাসন। ভুবনেশ্বর নদী খনন (খাল কাটা) কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন মেরেকেটে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক ঘাম ঝরালেও, খাতায়-কলমে দিব্যি ১৭৮ জন ‘ভূতুড়ে শ্রমিক’ দেখিয়ে সরকারি কোষাগার ফাঁকা করার সুনিপুণ ছক কষেছে এক প্রভাবশালী চক্র। আর এই মহা-লুঠপাটের খবর চাউর হতেই তেলিবারী ঘাট থেকে শুরু করে গোটা উপজেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও গণ-অসন্তোষের আগুন জ্বলছে।

নথিপত্র ও অভিযোগের গভীরে চোখ রাখলে চোখ চড়কগাছ হতে বাধ্য। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১৭৮ জন শ্রমিকের নামে ২২ দিনের মজুরি হিসেবে জনপ্রতি দৈনিক ৫০০ টাকা হারে মোট ১১ হাজার টাকা করে পকেটে পোরা হয়েছে। জালিয়াতির খিদে সেখানেই মেটেনি; দ্বিতীয় ধাপে ওই তালিকা থেকে মাত্র পাঁচজন বাদ দিয়ে ১৭৩ জনের মোটা অঙ্কের বিল তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রের খবর, দ্বিতীয় ধাপের এই ‘ভূতুড়ে’ মজুরি মেটানোর জন্য প্রায় এক সপ্তাহ আগেই ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা সোনালী ব্যাংকের হাজীগঞ্জ শাখায় জমা করে দেওয়া হয়েছে। গত ২০ জুলাই পর্যন্ত ১২৫ জন শ্রমিক টাকা তুললেও, তালিকাভুক্ত বাকি ৪৮ জন শ্রমিকের কোনো হদিস বা অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছে না খোদ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ!

‘পুকুর চুরি নয়, এ তো আস্ত সাগর চুরি!’

কাগজের বাঘেদের এই কারসাজি ধরে ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। তেলিবারী ঘাট এলাকার এক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৩৩ দিন কাজ হয়েছে। আমরা নিজের চোখে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি শ্রমিককে মাঠে দেখিনি। অথচ অফিসে নাকি ১৭৮ জনের বিল দাখিল করা হয়েছে! এটাকে পুকুর চুরি বললেও কম হবে, এ যেন আস্ত সাগর চুরি।”

এদিকে, এই হরিলুটের দায় এড়াতে আমলাতান্ত্রিক টালবাহানা শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আমিনুল ইসলামের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাফ দায় ঝেড়ে ফেলে বলেন, “আমাদের কাছে ১৭৮ জন শ্রমিকের মাস্টাররোল জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে টাকা পাঠানো হয়েছিল। এখন যদি বলা হয় শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে সেটি কেমন কথা? তবে বর্তমানে আমি বদলি হয়ে গেছি, তাই এর বেশি কিছু বলতে পারব না।” বদলি হয়ে গেলেই কি দুর্নীতির দায় ধুয়ে যায়? এই অমোঘ প্রশ্ন এখন চরের বাতাসে ভাসছে। অন্যদিকে, জালিয়াতির মূল কারিগর তথা প্রকল্প কমিটির সেক্রেটারি মো. বশির মোল্লার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন, কোনো সন্তোষজনক জবাব তাঁর গলা থেকে বের হয়নি।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও চাবুকের মতো শাস্তির দাবি

এই কোটি টাকার ভূতুড়ে কাণ্ড আর মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি নন চরভদ্রাসনের সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, লোকদেখানো তদন্ত নয়, বরং প্রকল্পের আসল শ্রমিক তালিকা, মাস্টাররোল, উপস্থিতি রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব এবং মাঠে কাজ করা প্রকৃত শ্রমিকদের পরিচয় মিলিয়ে দেখে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সাথে এই জালিয়াতির সাথে যুক্ত রাঘববোয়ালদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি চাবুক মারার জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।

কাগজে ১৭৮, মাঠে ৫০! ফরিদপুরে নদী খননে ‘ভূতুড়ে শ্রমিক’ নামিয়ে লুঠপাট

আপডেট সময় : ০১:০০:০০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

সরকারি টাকা মানেই কি তবে হরিলুট? নদী খননের নামে খালের জল ঘোলা করে লাখ লাখ টাকা পকেটে পোরার এক নজিরবিহীন ও বর্বরোচিত জালিয়াতির সাক্ষী থাকল ফরিদপুরের চরভদ্রাসন। ভুবনেশ্বর নদী খনন (খাল কাটা) কর্মসূচিতে মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন মেরেকেটে ৫০ থেকে ৬০ জন শ্রমিক ঘাম ঝরালেও, খাতায়-কলমে দিব্যি ১৭৮ জন ‘ভূতুড়ে শ্রমিক’ দেখিয়ে সরকারি কোষাগার ফাঁকা করার সুনিপুণ ছক কষেছে এক প্রভাবশালী চক্র। আর এই মহা-লুঠপাটের খবর চাউর হতেই তেলিবারী ঘাট থেকে শুরু করে গোটা উপজেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও গণ-অসন্তোষের আগুন জ্বলছে।

নথিপত্র ও অভিযোগের গভীরে চোখ রাখলে চোখ চড়কগাছ হতে বাধ্য। প্রকল্পের প্রথম ধাপে ১৭৮ জন শ্রমিকের নামে ২২ দিনের মজুরি হিসেবে জনপ্রতি দৈনিক ৫০০ টাকা হারে মোট ১১ হাজার টাকা করে পকেটে পোরা হয়েছে। জালিয়াতির খিদে সেখানেই মেটেনি; দ্বিতীয় ধাপে ওই তালিকা থেকে মাত্র পাঁচজন বাদ দিয়ে ১৭৩ জনের মোটা অঙ্কের বিল তোলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর সূত্রের খবর, দ্বিতীয় ধাপের এই ‘ভূতুড়ে’ মজুরি মেটানোর জন্য প্রায় এক সপ্তাহ আগেই ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা সোনালী ব্যাংকের হাজীগঞ্জ শাখায় জমা করে দেওয়া হয়েছে। গত ২০ জুলাই পর্যন্ত ১২৫ জন শ্রমিক টাকা তুললেও, তালিকাভুক্ত বাকি ৪৮ জন শ্রমিকের কোনো হদিস বা অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছে না খোদ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ!

‘পুকুর চুরি নয়, এ তো আস্ত সাগর চুরি!’

কাগজের বাঘেদের এই কারসাজি ধরে ফেলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। তেলিবারী ঘাট এলাকার এক প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “প্রকল্পে সর্বোচ্চ ৩৩ দিন কাজ হয়েছে। আমরা নিজের চোখে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জনের বেশি শ্রমিককে মাঠে দেখিনি। অথচ অফিসে নাকি ১৭৮ জনের বিল দাখিল করা হয়েছে! এটাকে পুকুর চুরি বললেও কম হবে, এ যেন আস্ত সাগর চুরি।”

এদিকে, এই হরিলুটের দায় এড়াতে আমলাতান্ত্রিক টালবাহানা শুরু হয়ে গেছে। প্রকল্পের তৎকালীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আমিনুল ইসলামের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি সাফ দায় ঝেড়ে ফেলে বলেন, “আমাদের কাছে ১৭৮ জন শ্রমিকের মাস্টাররোল জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে টাকা পাঠানো হয়েছিল। এখন যদি বলা হয় শ্রমিক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে সেটি কেমন কথা? তবে বর্তমানে আমি বদলি হয়ে গেছি, তাই এর বেশি কিছু বলতে পারব না।” বদলি হয়ে গেলেই কি দুর্নীতির দায় ধুয়ে যায়? এই অমোঘ প্রশ্ন এখন চরের বাতাসে ভাসছে। অন্যদিকে, জালিয়াতির মূল কারিগর তথা প্রকল্প কমিটির সেক্রেটারি মো. বশির মোল্লার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি মুখে কুলুপ এঁটেছেন, কোনো সন্তোষজনক জবাব তাঁর গলা থেকে বের হয়নি।

নিরপেক্ষ তদন্ত ও চাবুকের মতো শাস্তির দাবি

এই কোটি টাকার ভূতুড়ে কাণ্ড আর মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি নন চরভদ্রাসনের সাধারণ মানুষ। স্থানীয়দের স্পষ্ট দাবি, লোকদেখানো তদন্ত নয়, বরং প্রকল্পের আসল শ্রমিক তালিকা, মাস্টাররোল, উপস্থিতি রেজিস্টার, ব্যাংক হিসাব এবং মাঠে কাজ করা প্রকৃত শ্রমিকদের পরিচয় মিলিয়ে দেখে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সাথে এই জালিয়াতির সাথে যুক্ত রাঘববোয়ালদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি চাবুক মারার জন্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন তারা।