ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারে কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, বরখাস্ত ৫
- আপডেট সময় : ১১:১২:০৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
- / 157
যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই কি তবে নৈশভোজের আয়োজন? যে শিশুদের নিরাপত্তা, সুরক্ষাকবচ আর মাতৃত্বের ছায়া দেওয়ার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব নিয়েছে স্বয়ং রাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্রীয় আশ্রয়কেন্দ্রের চার দেওয়ালের ভেতরেই ঘটে গেল এক হাড়হিম করা ঘটনা। ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) থাকা মাত্র ১৪ বছর বয়সী এক অনাথ কিশোরী এখন ২৭ সপ্তাহেরও বেশি দিনের অন্তঃসত্ত্বা! এই পৈশাচিক ও লজ্জাজনক ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই সমাজসেবা অধিদপ্তরের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র কম্পন। দায়িত্ব অবহেলার চরম খেসারত হিসেবে এক ধাক্কায় সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে ৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। আর মূল অভিযুক্ত এক দর্জিকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে কোতোয়ালি থানা পুলিশ। কিন্তু এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, এ দেশে সরকারি হোমের নিরাপত্তা কতটা ঠুনকো আর কঙ্কালসার।
আজ শুক্রবার সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. সাইফুল ইসলাম এই ৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বরখাস্তের আদেশটি নিশ্চিত করেছেন। শাস্তির কোপ পড়েছে সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার এবং আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীন—এই পাঁচজনের ওপর।
চকোলেটের প্রলোভন ও দর্জির দোকানে লালসা: কীভাবে ঘটল এই সর্বনাশ?
মামলার এজাহার ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওই হতভাগ্য কিশোরীটি ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা এলাকার একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। সরকারি শিশু পরিবারে থেকে সে প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করত। আর এই যাতায়াতের পথেই পাতা হয়েছিল এক পৈশাচিক ফাঁদ।
অভিযোগ রয়েছে, গত ৫ জানুয়ারি স্কুলে যাওয়ার পথে স্থানীয় এক দর্জির দোকানের মালিক মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪) নামের এক প্রৌঢ় তাকে চকোলেটের প্রলোভন দেখিয়ে নিজের দোকানে ডেকে নেয় এবং সেখানে তাকে প্রথমবার ধর্ষণ করে। এরপর বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে মেয়েটির ওপর একাধিকবার চলে পাশবিক নির্যাতন। লোকলজ্জা আর আতঙ্কে দীর্ঘ সময় বিষয়টি বুকেই চেপে রেখেছিল ওই নাবালিকা। কিন্তু প্রকৃতি তো সত্য আড়াল করে না! গত ৬ জুলাই মেয়েটির শরীরে তীব্র জটিলতা দেখা দিলে টনক নড়ে হোম কর্তৃপক্ষের। চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে সবার—চিকিৎসক সাফ জানিয়ে দেন, ওই কিশোরী তখন ২৭ সপ্তাহ ২ দিনের অন্তঃসত্ত্বা!
৭ মাস ধরে অদৃশ্য গর্ভ! সর্ষের মধ্যেই কি তবে ভূত?
এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই ফরিদপুর জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় সচেতন মহল। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও সরকারি শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করার পর গত ৮ জুলাই ধর্ষক ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে চাবুকের মতো প্রশ্ন একটাই—
“সরকারি হোমে থাকা একটা মেয়ের শরীরে সাত মাস ধরে একটা প্রাণ বেড়ে উঠল, তার শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটল, অথচ ২৪ ঘণ্টা নজরদারিতে রাখা মেট্রন, আয়া আর তত্ত্বাবধায়কদের চোখে তা ধুলোবালি হয়ে রইল? শুধু একটা দর্জিকে ধরলেই কি রাষ্ট্রের পাপ ধুয়ে যাবে? এই অন্ধত্বের নেপথ্যে কি অন্য কোনো গভীর আঁতাত ছিল না?”
নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের সরকারি আবাসিক প্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, কঠোর শারীরিক পর্যবেক্ষণ ও মানসিক কাউন্সেলিং করার কথা। কিন্তু এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, খাতাকলমে থাকা সেই তদারকির বুদবুদ আসলে কতটা ফাঁপা। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ এহিয়াতুজ্জামান জানান, আদালতের নির্দেশে কিশোরীকে আপাতত ওই হোম থেকে সরিয়ে সমাজসেবা বিভাগের অধীন নারী ও শিশু কিশোরী হেফাজতিদের নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে (সেফ হোম) রাখা হয়েছে।





















