ফরিদপুরে মোশারফের ‘আলাদিনের চেরাগ’: বাবুর্চি থেকে শত কোটি টাকার মালিক!
- আপডেট সময় : ০৪:২১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ জুন ২০২৫
- / 962
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দিনমজুর বাবার সন্তান, নিরক্ষর মো. মোশারফ শেখ (৪৭), যিনি একসময় হোটেল বাবুর্চি ছিলেন, তিনি এখন শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে গ্রামের অসহায় কৃষকের জমি দখলসহ সাধারণ মানুষকে হয়রানি করার।
মোশারফ শেখ ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক রহমান শেখের ছেলে। তিনি ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পান এবং ২৭ বছর ধরে এই পদে ছিলেন। তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মোশারফ গা ঢাকা দিয়েছেন।
জমি দখল ও হয়রানির অভিযোগ
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক মো. চাঁনমিয়া ফকিরের ছেলে মো. সাগর মিয়া জমি দখলের অভিযোগ দায়ের করেছেন। এরপর থেকেই মোশারফের নানা অপকর্ম, নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-জুলুম এবং অস্বাভাবিক উপায়ে অর্জিত সম্পদের তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, কৃষক চাঁনমিয়া ফকিরের বড় কামদিয়া ৮১ নম্বর মৌজার ৬১৮ নম্বর দাগের ৪৩ শতাংশ জমি মোশারফ শেখ জোরপূর্বক দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময় ওই জমি ছেড়ে দিতে বললে মোশারফ তাদের হুমকি-ধামকি ও মারপিট করে এলাকাছাড়া করে রাখতেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১ জুন কৃষক চাঁনমিয়ার পরিবার দখল করা জমি উদ্ধার করতে গেলে মোশারফ ও তার লোকজন আবারও ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে।
ভুক্তভোগী কৃষক চাঁনমিয়া ফকিরের ভাতিজা সেন্টু ফকির বলেন, “আমার চাচা একজন গরিব কৃষক। স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার বাবুর্চি মোশারফ হোসেন তার ৪২ শতাংশ জমি দখল করে পাকা ঘর নির্মাণ করেন। এবং ওই ঘরের চালের ওপর একটি নৌকা তৈরি করে টানিয়ে রাখেন।” তিনি আরও বলেন, “তখন আমরা পুলিশ-প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। বরং জমি দখল নিয়ে মুখ খুললেই আমাদেরকে মারধর করে ও মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করে রাখতেন মোশারফ। শুধু আমাদের পরিবার নয়, মোশারফ শেখ হাসিনার বাবুর্চি হওয়ায় পুরো বড় কামদিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছেন।”
অভাব থেকে অঢেল সম্পদ
মোশারফের প্রতিবেশী মো. জামাল শেখ জানান, মোশারফের বাবা অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতেন। অভাবের কারণে মোশারফ পড়ালেখাও করতে পারেননি এবং ছোটবেলা থেকেই পাবনা শহরের একটি হোটেলে বাবুর্চির কাজ করতেন। সে সময় তিনি বাবার সম্পত্তির মাত্র ৫ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পাওয়ার পর যেন তিনি ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়ে যান। বর্তমানে কামদিয়া গ্রামে তার ২ বিঘা জমির ওপর বিশাল বাড়ি রয়েছে। মাঠেও ৩ বিঘা জমি কিনেছেন তিনি।
জামাল শেখ আরও বলেন, “ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দী এলাকায় ১২ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি ও রাজবাড়ি রাস্তামোড় এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি রয়েছে তার। এ ছাড়া ঢাকা ও ফরিদপুর শহরে একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও গাড়ি রয়েছে বলে মোশারফ নিজেই আমাদের কাছে বলেছেন। বর্তমান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যদি অনুসন্ধান করে তাহলে মোশারফের অনেক অজানা তথ্য ও সম্পদের হিসাব বেরিয়ে আসবে।”
ত্রাসের রাজত্ব ও পারিবারিক নির্যাতন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেখ হাসিনার বাবুর্চি হওয়ার সুবাদে সম্পদ গড়ার পাশাপাশি মোশারফ তার নিজ গ্রামে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে চেয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের ওপর হামলা-মামলা ও তাদেরকে জিম্মি করে জমি দখল ও সালিশ বাণিজ্য করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ওই গ্রামের যুবলীগ নেতা নুর ইসলাম তার প্রতিপক্ষ হওয়ায় তেমন সুবিধা করতে পারেননি তিনি। ২০১৫ সালে যুবলীগ নেতা নুর ইসলামের সমর্থকরা তাকে ধাওয়া দিয়ে এলাকাছাড়া করে দেন। এরপর তিনি নুর ইসলামের সাথে মিলে ফের এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন।
বড় কামদিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, ক্ষমতার বলে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন মোশারফ। শুধু গ্রামবাসীর ওপর অত্যাচার করেই ক্ষান্ত হননি তিনি, নিজের পরিবারও রেহাই পায়নি তার কাছ থেকে। গত চার বছর আগে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে আটকে রেখে নিজের স্ত্রীকে জোর করে বাড়ি থেকে বের করে দেন মোশারফ। এখনো তার স্ত্রী বাড়িতে আসার সুযোগ পাননি।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোশারফ শেখের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
দুর্নীতি দমন কমিটির বক্তব্য ও পুলিশের প্রতিক্রিয়া
ফরিদপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাসানউজ্জামান বলেন, “ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বাসার একজন বাবুর্চি কত টাকা বেতন পেয়েছেন? বেতন অনুযায়ী তার তো এত সম্পদের মালিক হবার কথা না। নিশ্চয় তিনি দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন। এখন তার সম্পদের বিষয়টি যেহেতু সামনে এসেছে, তাই তার সম্পদের বিষয়টি অবশ্যই সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি।”
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, “জমি দখলের বিষয় নিয়ে মোশারফের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




















