ঢাকা ০৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১টি আলমারি, ১৬টি বই ও ভাঙা টেবিল! ফরিদপুরে ‘কায়েদে আজম’ থেকে ‘শেরে বাংলা’

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০২:১৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬
  • / 127

মফস্বল শহরের এক কোণে, ধুলো জমা বইয়ের গন্ধ আর হলদেটে হয়ে যাওয়া পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে একটা আস্ত অঞ্চলের ইতিহাস। আধুনিকতার করাল গ্রাসে যখন লাইব্রেরি কালচার বা বই পড়ার অভ্যাস প্রায় বিলুপ্তির পথে, ঠিক তখনই প্রাচীন জেলা শহর ফরিদপুরের বুকে প্রায় পাঁচ যুগ ধরে অগণিত জ্ঞানপিপাসুর তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে এক অনন্য বাতিঘর—‘শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার’। কোনো শোরগোল নেই, নেই কোনো প্রচারের আলো; চাদমারীর শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে এই সারস্বত প্রতিষ্ঠানটি দশকের পর দশক ধরে নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে তার সাধনা।

তবে আজকের এই মহীরুহ হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস। যার শুরুটা হয়েছিল একটিমাত্র আলমারি আর ১৬ খানা বইয়ের এক অতি সাধারণ পুঁজি নিয়ে।

‘কায়েদে আজম’ থেকে ‘শেরে বাংলা’: এক ঐতিহাসিক রূপান্তর

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৫০ সালের মে মাসে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ‘কায়েদে আজম মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করা হয়েছিল। তৎকালীন অফিসার্স ক্লাবের একটি অব্যবহৃত ভবনে শুরু হয় এর যাত্রা। শুরুর দিনগুলো ছিল বড্ড নুন-আনতে-পান্তা-ফুরানোর মতো। ফরিদপুর ক্লাব থেকে উপহার পাওয়া ১টি আলমারি আর মাত্র ১৬টি বই ছিল এর সম্বল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ‘অম্বিকা স্মৃতি পাঠাগার’-এর একটি ভাঙা বিলিয়ার্ড টেবিল ও কিছু আসবাবপত্র।

এই পাঠাগারটির মূল রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক আলহাজ আবদ আল্লাহ জহীর উদ্দিন লাল মিয়া। তাঁকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস. জি কবীর, প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল ও সমাজসেবক মোতাহার হোসেন মিয়ার মতো গুণীজনেরা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এ.কে.এম. আ. হাকিম মিয়া কোনো প্রকার বেতন-ভাতা ছাড়াই দীর্ঘ ৮ বছর অবৈতনিক লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিজের শ্রম দিয়ে এই বাতিঘরকে টিকিয়ে রেখেছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে চানমারীর বাগানে নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৮ সালে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে। তবে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আসে এক বড় বদল। ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল, স্বাধীন বাংলাদেশের আবহে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর ও নাসির উদ্দিন আহমেদ মুসাদের উদ্যোগে ‘কায়েদে আজম’ নামটি মুছে ফেলে বাঙালির নিজস্ব অহংকার ‘শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার’ নামে পুনর্জন্ম হয় এই প্রতিষ্ঠানের।

১৯ হাজার বইয়ের সিন্দুক, আজও প্রতিদিন শতাধিক পাঠকের ভিড়

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রশাসনের আন্তরিকতায় ২০০১ সালের পর এই পাঠাগারে নতুন করে গতি আসে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া বিশেষ অনুদান এবং নতুন গ্রন্থাগারিক ও কর্মী নিয়োগের ফলে লাইব্রেরিটি আধুনিক রূপ পেতে শুরু করে। ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই লাইব্রেরির তাকে সাজানো রয়েছে প্রায় ১৯ হাজারেরও বেশি অমূল্য বই।

লাইব্রেরির বর্তমান চিত্র

সপ্তাহের ৬ দিনই চাদমারীর এই শান্ত আঙিনায় ভিড় জমান শহরের বইপ্রেমীরা। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক পাঠক এখানে আসেন কেবল খবরের কাগজ ও সাময়িকী পড়তে। কোনো কোলাহল নেই, কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই—শহুরে যান্ত্রিকতার আড়ালে এ যেন এক টুকরো তপোবন।

ফরিদপুরের এই ঐতিহাসিক পাঠাগারটি কেবল বইয়ের গুদাম নয়, এটি এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সাক্ষী। ডিজিটাল স্ক্রিনের যুগেও শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার ফরিদপুরের বুকে যেভাবে অক্ষরের মর্যাদা ধরে রেখেছে, তা এককথায় অনন্য ও দৃষ্টান্তমূলক।

১টি আলমারি, ১৬টি বই ও ভাঙা টেবিল! ফরিদপুরে ‘কায়েদে আজম’ থেকে ‘শেরে বাংলা’

আপডেট সময় : ০২:১৩:৩৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ জুলাই ২০২৬

মফস্বল শহরের এক কোণে, ধুলো জমা বইয়ের গন্ধ আর হলদেটে হয়ে যাওয়া পাতার ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে একটা আস্ত অঞ্চলের ইতিহাস। আধুনিকতার করাল গ্রাসে যখন লাইব্রেরি কালচার বা বই পড়ার অভ্যাস প্রায় বিলুপ্তির পথে, ঠিক তখনই প্রাচীন জেলা শহর ফরিদপুরের বুকে প্রায় পাঁচ যুগ ধরে অগণিত জ্ঞানপিপাসুর তৃষ্ণা মিটিয়ে চলেছে এক অনন্য বাতিঘর—‘শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার’। কোনো শোরগোল নেই, নেই কোনো প্রচারের আলো; চাদমারীর শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশে এই সারস্বত প্রতিষ্ঠানটি দশকের পর দশক ধরে নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে তার সাধনা।

তবে আজকের এই মহীরুহ হয়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে এক দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ এবং রোমাঞ্চকর ইতিহাস। যার শুরুটা হয়েছিল একটিমাত্র আলমারি আর ১৬ খানা বইয়ের এক অতি সাধারণ পুঁজি নিয়ে।

‘কায়েদে আজম’ থেকে ‘শেরে বাংলা’: এক ঐতিহাসিক রূপান্তর

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৫০ সালের মে মাসে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে ‘কায়েদে আজম মেমোরিয়াল পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করা হয়েছিল। তৎকালীন অফিসার্স ক্লাবের একটি অব্যবহৃত ভবনে শুরু হয় এর যাত্রা। শুরুর দিনগুলো ছিল বড্ড নুন-আনতে-পান্তা-ফুরানোর মতো। ফরিদপুর ক্লাব থেকে উপহার পাওয়া ১টি আলমারি আর মাত্র ১৬টি বই ছিল এর সম্বল। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল বন্ধ হয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক ‘অম্বিকা স্মৃতি পাঠাগার’-এর একটি ভাঙা বিলিয়ার্ড টেবিল ও কিছু আসবাবপত্র।

এই পাঠাগারটির মূল রূপকার ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিক আলহাজ আবদ আল্লাহ জহীর উদ্দিন লাল মিয়া। তাঁকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এস. জি কবীর, প্রধান শিক্ষক আব্দুল আউয়াল ও সমাজসেবক মোতাহার হোসেন মিয়ার মতো গুণীজনেরা। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে এ.কে.এম. আ. হাকিম মিয়া কোনো প্রকার বেতন-ভাতা ছাড়াই দীর্ঘ ৮ বছর অবৈতনিক লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিজের শ্রম দিয়ে এই বাতিঘরকে টিকিয়ে রেখেছিলেন।

পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে চানমারীর বাগানে নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৮ সালে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘটে। তবে ১৯৭১-এর রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর আসে এক বড় বদল। ১৯৭২ সালের ৪ এপ্রিল, স্বাধীন বাংলাদেশের আবহে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর ও নাসির উদ্দিন আহমেদ মুসাদের উদ্যোগে ‘কায়েদে আজম’ নামটি মুছে ফেলে বাঙালির নিজস্ব অহংকার ‘শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার’ নামে পুনর্জন্ম হয় এই প্রতিষ্ঠানের।

১৯ হাজার বইয়ের সিন্দুক, আজও প্রতিদিন শতাধিক পাঠকের ভিড়

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর প্রশাসনের আন্তরিকতায় ২০০১ সালের পর এই পাঠাগারে নতুন করে গতি আসে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া বিশেষ অনুদান এবং নতুন গ্রন্থাগারিক ও কর্মী নিয়োগের ফলে লাইব্রেরিটি আধুনিক রূপ পেতে শুরু করে। ২০০৮ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই লাইব্রেরির তাকে সাজানো রয়েছে প্রায় ১৯ হাজারেরও বেশি অমূল্য বই।

লাইব্রেরির বর্তমান চিত্র

সপ্তাহের ৬ দিনই চাদমারীর এই শান্ত আঙিনায় ভিড় জমান শহরের বইপ্রেমীরা। প্রতিদিন গড়ে শতাধিক পাঠক এখানে আসেন কেবল খবরের কাগজ ও সাময়িকী পড়তে। কোনো কোলাহল নেই, কোনো বাড়তি ঝামেলা নেই—শহুরে যান্ত্রিকতার আড়ালে এ যেন এক টুকরো তপোবন।

ফরিদপুরের এই ঐতিহাসিক পাঠাগারটি কেবল বইয়ের গুদাম নয়, এটি এই অঞ্চলের কয়েক প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সাক্ষী। ডিজিটাল স্ক্রিনের যুগেও শেরে বাংলা সাধারণ পাঠাগার ফরিদপুরের বুকে যেভাবে অক্ষরের মর্যাদা ধরে রেখেছে, তা এককথায় অনন্য ও দৃষ্টান্তমূলক।