ঢাকা ০১:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাবি শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলিয়ে ভিডিও ধারণ

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১০:৫৩:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • / 36

নেত্রকোনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নাট্যকলা ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের এক নিরীহ শিক্ষার্থীকে পথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও ‘মাদক কারবারি’ ট্যাগ দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন করার এক অত্যন্ত লোমহর্ষক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা ওই শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে বিবস্ত্র (বস্ত্রহীন) করে অমানুষিক নির্যাতন চালায়, মুক্তিপণ আদায় করে এবং জোরপূর্বক রাজনৈতিক বক্তব্য বলিয়ে সেই কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।

গত বুধবার (১০ জুন) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের পূর্বধলা উপজেলার ত্রিমোহনীর সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. শরীফ হোসেন। তিনি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার শুনই এলাকার জানু মিয়ার ছেলে।

ইজিবাইক থেকে নামিয়ে জিম্মি ও বিবস্ত্র করে নির্যাতন:

পুলিশ ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, পবিত্র ঈদ উপলক্ষে জাবি শিক্ষার্থী শরীফ গ্রামের বাড়িতে যান। গত মঙ্গলবার তিনি নেত্রকোনা সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গদাইকান্দি গ্রামে তাঁর বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। পরদিন বুধবার বিকেলে তিনি নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের বাইপাস মোড় এলাকায় ঘুরতে বের হন এবং সন্ধ্যার পর একটি ইজিবাইকযোগে পূর্বধলা সদরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে ত্রিমোহনী সেতু পার হয়ে সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় পৌঁছালে দুই যুবক ইজিবাইকের গতি রোধ করে শরীফকে জোরপূর্বক নামিয়ে নেয়।

পরে আরও এক যুবক সেখানে যুক্ত হয়ে তিনজনে মিলে নির্জন স্থানে নিয়ে শরীফকে প্রথমে ‘মাদক কারবারি’ এবং পরবর্তীতে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ট্যাগ দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর ও নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁর মুক্তিপণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। প্রাণভয়ে শরীফ নিজের কাছে থাকা নগদ ৫০০ টাকা এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিকাশের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার টাকা এনে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন। এরপরও ক্ষান্ত না হয়ে যুবকরা তাঁর ব্যবহৃত দামী স্মার্টফোনটি ছিনিয়ে নেয় এবং তাঁকে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন (বিবস্ত্র) করে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে।

কান্নাজড়িত জোরপূর্বক জবানবন্দির ভিডিও ভাইরাল:

বুধবার রাত ১২টার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর নির্যাতনের ২৩ সেকেন্ডের একটি লোমহর্ষক ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত ও বিবস্ত্র অবস্থায় শরীফ হোসেনকে কাঁদানো হচ্ছে এবং জোরপূর্বক বলানো হচ্ছে— “আমি একজন জুলাই যোদ্ধা, আমি আর জুলাই করতাম না। জুলাই…। আমি আগে ভুল করছি ছাত্রদের পক্ষে থাইক্কা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।” ভিডিওতে বস্ত্রহীন অবস্থায় শরীফের ঠোঁটে জমাট বাঁধা তাজা রক্তের দাগ এবং তাঁর অসহায় কান্নার দৃশ্য দেখে সর্বস্তরের মানুষ অপরাধীদের শাস্তির দাবি তুলছেন।

রাজনীতির সাথে জড়িত নই, চরম ট্রমার মধ্যে আছি:

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এসে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শরীফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “তিন যুবক হঠাৎ আমাকে থামিয়ে অন্ধকারে নির্জন জায়গায় নিয়ে বিবস্ত্র করে অমানসিক নির্যাতন করেছে। আমি অন্ধকার থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। আমি কোনোদিন কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, এমনকি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গেও আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আমাকে মিথ্যা ট্যাগ দিয়ে এই সর্বনাশ করা হয়েছে। আমি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এবং এক ভয়াবহ ট্রমার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি।”

এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ এবং জেলা কমিটির সদস্যসচিব মো. ফাহিম রহমান খান পাঠান।

কঠোর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস পুলিশ সুপারের:

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি নজরে আসার সাথে সাথেই পুলিশ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করেছে। তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ঘটনাস্থল পূর্বধলা থানা এলাকায়, তাই সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এই জঘন্য অপরাধে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে গ্রেফতারপূর্বক আইনের আওতায় আনা হবে।

জাবি শিক্ষার্থীকে বিবস্ত্র করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলিয়ে ভিডিও ধারণ

আপডেট সময় : ১০:৫৩:৫২ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

নেত্রকোনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) নাট্যকলা ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের এক নিরীহ শিক্ষার্থীকে পথ থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ও ‘মাদক কারবারি’ ট্যাগ দিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় বর্বরোচিত নির্যাতন করার এক অত্যন্ত লোমহর্ষক ও ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। দুর্বৃত্তরা ওই শিক্ষার্থীকে জিম্মি করে বিবস্ত্র (বস্ত্রহীন) করে অমানুষিক নির্যাতন চালায়, মুক্তিপণ আদায় করে এবং জোরপূর্বক রাজনৈতিক বক্তব্য বলিয়ে সেই কান্নার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছে।

গত বুধবার (১০ জুন) রাত ৮টার দিকে নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের পূর্বধলা উপজেলার ত্রিমোহনীর সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় এই পৈশাচিক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর নাম মো. শরীফ হোসেন। তিনি নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার শুনই এলাকার জানু মিয়ার ছেলে।

ইজিবাইক থেকে নামিয়ে জিম্মি ও বিবস্ত্র করে নির্যাতন:

পুলিশ ও ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, পবিত্র ঈদ উপলক্ষে জাবি শিক্ষার্থী শরীফ গ্রামের বাড়িতে যান। গত মঙ্গলবার তিনি নেত্রকোনা সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গদাইকান্দি গ্রামে তাঁর বড় বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। পরদিন বুধবার বিকেলে তিনি নেত্রকোনা-পূর্বধলা সড়কের বাইপাস মোড় এলাকায় ঘুরতে বের হন এবং সন্ধ্যার পর একটি ইজিবাইকযোগে পূর্বধলা সদরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে ত্রিমোহনী সেতু পার হয়ে সিন্দুররাটিয়া শালদিঘা এলাকায় পৌঁছালে দুই যুবক ইজিবাইকের গতি রোধ করে শরীফকে জোরপূর্বক নামিয়ে নেয়।

পরে আরও এক যুবক সেখানে যুক্ত হয়ে তিনজনে মিলে নির্জন স্থানে নিয়ে শরীফকে প্রথমে ‘মাদক কারবারি’ এবং পরবর্তীতে ‘জুলাই যোদ্ধা’ ট্যাগ দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর ও নির্যাতন শুরু করে। একপর্যায়ে তাঁর মুক্তিপণ হিসেবে ২০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। প্রাণভয়ে শরীফ নিজের কাছে থাকা নগদ ৫০০ টাকা এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিকাশের মাধ্যমে আরও ১০ হাজার টাকা এনে মোট সাড়ে ১০ হাজার টাকা দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেন। এরপরও ক্ষান্ত না হয়ে যুবকরা তাঁর ব্যবহৃত দামী স্মার্টফোনটি ছিনিয়ে নেয় এবং তাঁকে সম্পূর্ণ বস্ত্রহীন (বিবস্ত্র) করে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করে।

কান্নাজড়িত জোরপূর্বক জবানবন্দির ভিডিও ভাইরাল:

বুধবার রাত ১২টার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই শিক্ষার্থীর নির্যাতনের ২৩ সেকেন্ডের একটি লোমহর্ষক ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে জেলাজুড়ে তীব্র তোলপাড় ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, রক্তাক্ত ও বিবস্ত্র অবস্থায় শরীফ হোসেনকে কাঁদানো হচ্ছে এবং জোরপূর্বক বলানো হচ্ছে— “আমি একজন জুলাই যোদ্ধা, আমি আর জুলাই করতাম না। জুলাই…। আমি আগে ভুল করছি ছাত্রদের পক্ষে থাইক্কা। জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু।” ভিডিওতে বস্ত্রহীন অবস্থায় শরীফের ঠোঁটে জমাট বাঁধা তাজা রক্তের দাগ এবং তাঁর অসহায় কান্নার দৃশ্য দেখে সর্বস্তরের মানুষ অপরাধীদের শাস্তির দাবি তুলছেন।

রাজনীতির সাথে জড়িত নই, চরম ট্রমার মধ্যে আছি:

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) দুপুরে নেত্রকোনা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এসে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী শরীফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “তিন যুবক হঠাৎ আমাকে থামিয়ে অন্ধকারে নির্জন জায়গায় নিয়ে বিবস্ত্র করে অমানসিক নির্যাতন করেছে। আমি অন্ধকার থাকায় কাউকে চিনতে পারিনি। আমি কোনোদিন কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম না, এমনকি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গেও আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। আমাকে মিথ্যা ট্যাগ দিয়ে এই সর্বনাশ করা হয়েছে। আমি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি এবং এক ভয়াবহ ট্রমার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি।”

এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) প্রীতম সোহাগ এবং জেলা কমিটির সদস্যসচিব মো. ফাহিম রহমান খান পাঠান।

কঠোর আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস পুলিশ সুপারের:

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি নজরে আসার সাথে সাথেই পুলিশ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করেছে। তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এনে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়েছে। যেহেতু ঘটনাস্থল পূর্বধলা থানা এলাকায়, তাই সেখানে একটি সুনির্দিষ্ট মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে। এই জঘন্য অপরাধে জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে গ্রেফতারপূর্বক আইনের আওতায় আনা হবে।