ঢাকা ০৭:২১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফরিদপুরে শেখ হাসিনার বাবুর্চির ‘মায়াবী হাত’: মোশারফের ছোঁয়ায় মাটিও সোনা!

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫
  • / 627

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের দুর্নীতির একের পর এক তথ্য বেরিয়ে আসছে এবং দুদকে অভিযোগের পাহাড় জমছে, তখন এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসার বাবুর্চি মো. মোশারফ শেখের (৪৭) বিরুদ্ধেও ভয়াবহ সব অভিযোগ সামনে এসেছে। অশিক্ষিত এই বাবুর্চি এখন শত শত কোটি টাকার মালিক!

একসময় দিনমজুর বাবার সন্তান মোশারফ শেখ নিজের নামটিও ঠিকমতো লিখতে পারতেন না। প্রায় ৩০ বছর আগে একটি হোটেলে বাবুর্চি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। মাত্র দুই বছর পরই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। ১৯৯৬ সালে তিনি তৎকালীন (পরে ক্ষমতাচ্যুত) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পান। বাবার সম্পত্তি থেকে মাত্র ৫ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন মোশারফ। কিন্তু এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও জমি দখলের অভিযোগ

অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবুর্চি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে মোশারফ তার নিজ গ্রামের প্রতিবেশী কৃষকদের জমি দখলসহ সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন।

জানা যায়, মোশারফ প্রায় ২৮ বছর ধরে শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চি ছিলেন এবং এই সময়েই তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। সালথার ভাওয়াল ইউনিয়নের বড় কামদিয়া গ্রামে এবং শহরজুড়ে রয়েছে তার একাধিক বাড়ি-গাড়ি।

তবে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মোশারফ গা ঢাকা দিয়েছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক মো. চাঁনমিয়া ফকিরের ছেলে সাগর মিয়া জমি দখলের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এরপর থেকেই মোশারফের নানা অপকর্ম, নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-জুলুম এবং অস্বাভাবিক উপায়ে অর্জিত সম্পদের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে মোশারফ শেখ কৃষক চাঁনমিয়া ফকিরের বড় কামদিয়া ৮১ নম্বর মৌজার ৬১৮ নম্বর দাগের ৪৩ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অভিযোগকারী আরও জানান, বিভিন্ন সময়ে ওই জমি ছেড়ে দিতে বললে মোশারফ তাদের হুমকি-ধমকি ও মারধর করে চাঁনমিয়া ও তার পরিবারকে এলাকাছাড়া করে রাখতেন। গত ১ জুন চাঁনমিয়ার পরিবারের লোকজন দখল করা জমি উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলে মোশারফের লোকেরা আবারও ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে।

চাঁনমিয়া ফকিরের ভাতিজা সেন্টু ফকির বলেন, “আমার চাচা একজন গরিব কৃষক। তার ৪২ শতাংশ জমি দখল করে মোশারফ পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন এবং ওই ঘরের চালে একটি নৌকা তৈরি করে টানিয়ে রেখেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “সে সময় আমরা পুলিশ-প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। বরং জমি দখল নিয়ে মুখ খুললেই মোশারফ আমাদেরকে মারধর করতেন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করে রাখতেন। শেখ হাসিনার বাবুর্চি হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি পুরো কামদিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছেন।”

অভাব থেকে অঢেল সম্পদ: দুর্নীতির অভিযোগ

মোশারফের প্রতিবেশী মো. জামাল শেখের ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পাওয়ার পর মোশারফ যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়ে যান। বর্তমানে কামদিয়া গ্রামে তার ২ বিঘা জমির ওপর বিশাল বাড়ি রয়েছে। মাঠেও কিনেছেন ৩ বিঘা জমি।

জামাল শেখ আরও জানান, ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকায় ১২ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি এবং রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর আরেকটি বাড়ি রয়েছে মোশারফের। এছাড়াও ঢাকা ও ফরিদপুর শহরে তার একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও গাড়ি রয়েছে বলে মোশারফ নিজেই তাদের কাছে বলেছেন। জামাল শেখ মনে করেন, বর্তমান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যদি অনুসন্ধান করে, তাহলে মোশারফের অনেক অজানা তথ্য ও বিপুল সম্পদের হিসাব বেরিয়ে আসবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য বাবুর্চি মোশারফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।

পুলিশি পদক্ষেপ

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, “জমি দখলের বিষয় নিয়ে মোশারফের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফরিদপুরে শেখ হাসিনার বাবুর্চির ‘মায়াবী হাত’: মোশারফের ছোঁয়ায় মাটিও সোনা!

আপডেট সময় : ০১:৪৫:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ জুন ২০২৫

ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন সাবেক এমপি-মন্ত্রীদের দুর্নীতির একের পর এক তথ্য বেরিয়ে আসছে এবং দুদকে অভিযোগের পাহাড় জমছে, তখন এবার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসার বাবুর্চি মো. মোশারফ শেখের (৪৭) বিরুদ্ধেও ভয়াবহ সব অভিযোগ সামনে এসেছে। অশিক্ষিত এই বাবুর্চি এখন শত শত কোটি টাকার মালিক!

একসময় দিনমজুর বাবার সন্তান মোশারফ শেখ নিজের নামটিও ঠিকমতো লিখতে পারতেন না। প্রায় ৩০ বছর আগে একটি হোটেলে বাবুর্চি হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু হয়। মাত্র দুই বছর পরই তার ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। ১৯৯৬ সালে তিনি তৎকালীন (পরে ক্ষমতাচ্যুত) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পান। বাবার সম্পত্তি থেকে মাত্র ৫ শতাংশ জমি পেয়েছিলেন মোশারফ। কিন্তু এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও জমি দখলের অভিযোগ

অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাবুর্চি হিসেবে প্রভাব খাটিয়ে মোশারফ তার নিজ গ্রামের প্রতিবেশী কৃষকদের জমি দখলসহ সাধারণ মানুষকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন।

জানা যায়, মোশারফ প্রায় ২৮ বছর ধরে শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চি ছিলেন এবং এই সময়েই তিনি শত শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। সালথার ভাওয়াল ইউনিয়নের বড় কামদিয়া গ্রামে এবং শহরজুড়ে রয়েছে তার একাধিক বাড়ি-গাড়ি।

তবে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মোশারফ গা ঢাকা দিয়েছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক মো. চাঁনমিয়া ফকিরের ছেলে সাগর মিয়া জমি দখলের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। এরপর থেকেই মোশারফের নানা অপকর্ম, নিরীহ মানুষের ওপর অত্যাচার-জুলুম এবং অস্বাভাবিক উপায়ে অর্জিত সম্পদের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে মোশারফ শেখ কৃষক চাঁনমিয়া ফকিরের বড় কামদিয়া ৮১ নম্বর মৌজার ৬১৮ নম্বর দাগের ৪৩ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অভিযোগকারী আরও জানান, বিভিন্ন সময়ে ওই জমি ছেড়ে দিতে বললে মোশারফ তাদের হুমকি-ধমকি ও মারধর করে চাঁনমিয়া ও তার পরিবারকে এলাকাছাড়া করে রাখতেন। গত ১ জুন চাঁনমিয়ার পরিবারের লোকজন দখল করা জমি উদ্ধারের চেষ্টা শুরু করলে মোশারফের লোকেরা আবারও ভয়ভীতি ও হুমকি দিচ্ছে।

চাঁনমিয়া ফকিরের ভাতিজা সেন্টু ফকির বলেন, “আমার চাচা একজন গরিব কৃষক। তার ৪২ শতাংশ জমি দখল করে মোশারফ পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন এবং ওই ঘরের চালে একটি নৌকা তৈরি করে টানিয়ে রেখেছেন।” তিনি আরও যোগ করেন, “সে সময় আমরা পুলিশ-প্রশাসনের কাছে গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি। বরং জমি দখল নিয়ে মুখ খুললেই মোশারফ আমাদেরকে মারধর করতেন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করে রাখতেন। শেখ হাসিনার বাবুর্চি হওয়ায় প্রভাব খাটিয়ে তিনি পুরো কামদিয়া গ্রামের সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছেন।”

অভাব থেকে অঢেল সম্পদ: দুর্নীতির অভিযোগ

মোশারফের প্রতিবেশী মো. জামাল শেখের ভাষ্যমতে, শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির চাকরি পাওয়ার পর মোশারফ যেন ‘আলাদিনের চেরাগ’ পেয়ে যান। বর্তমানে কামদিয়া গ্রামে তার ২ বিঘা জমির ওপর বিশাল বাড়ি রয়েছে। মাঠেও কিনেছেন ৩ বিঘা জমি।

জামাল শেখ আরও জানান, ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকায় ১২ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি এবং রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর আরেকটি বাড়ি রয়েছে মোশারফের। এছাড়াও ঢাকা ও ফরিদপুর শহরে তার একাধিক ফ্ল্যাট-প্লট ও গাড়ি রয়েছে বলে মোশারফ নিজেই তাদের কাছে বলেছেন। জামাল শেখ মনে করেন, বর্তমান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যদি অনুসন্ধান করে, তাহলে মোশারফের অনেক অজানা তথ্য ও বিপুল সম্পদের হিসাব বেরিয়ে আসবে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য বাবুর্চি মোশারফের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এমনকি তার গ্রামের বাড়িতে গিয়েও কাউকে পাওয়া যায়নি।

পুলিশি পদক্ষেপ

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান বলেন, “জমি দখলের বিষয় নিয়ে মোশারফের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”