ঢাকা ১০:৩৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঈদের দিনও খোঁজ নেয়নি সন্তানরা, ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে নিঃসঙ্গ বাবা-মা

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
  • আপডেট সময় : ০১:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ জুন ২০২৫
  • / 304

ঈদুল আজহার দিন, যখন সবাই পরিবার নিয়ে ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে, তখন ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে কাটছে নিঃসঙ্গতা আর কান্নার মধ্যে। এই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া ১৫ জন মা-বাবা এবারও সন্তানদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। অথচ এই সন্তানদের জন্যই তারা ত্যাগ করেছেন জীবনের সব সুখ।

বকুল বেগমের জীবন: সৎ মায়ের গ্লানি নিয়ে ঈদের সকাল

ষাটোর্ধ্ব বকুল বেগম বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় শান্তি নিবাসে পড়ে আছেন। নিজে খেতে পারেন না, কথা বলতেও কষ্ট হয়। জীবনে এক সময় স্বামীর আগের পক্ষের সন্তানদের ভালোবেসে বড় করেছেন। কিন্তু সৎ মায়ের কপাল বুঝি এমনই হয়—বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। বহু ঘুরে আশ্রয় মেলে শান্তি নিবাসে। এখন তিনি নিঃসঙ্গ, কিন্তু তবুও সন্তানদের জন্য দোয়া করেন।

লতিফ শিকদারের নিরব কান্না: সন্তানেরা যেন ভুলেই গেছে

নড়াইলের লতিফ শিকদার একসময় দর্জির কাজ করে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানরা তাকে হাসপাতালে রেখে আর ফিরে তাকায়নি। আজ তিনি কথা বলতে পারেন না, চোখে জল নিয়েই ঈদের দিনটা কেটেছে শান্তি নিবাসে।

সাজ্জাদ শেখ: সম্পত্তির বিনিময়ে একা হয়ে যাওয়া এক বাবা

একসময় সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন সাজ্জাদ শেখ। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলে তারাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। দ্বিতীয় বিয়েতেও একই পরিণতি। বর্তমানে শান্তি নিবাসেই কাটছে তার ৮ বছরের নিঃসঙ্গ জীবন। বলেন, “ছেলে মন্ত্রী হলেও আর তার কাছে যাবো না, এখানে ভালো আছি।”

ময়না বেগম ও আয়শা: ভাইয়ের অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার গল্প

ময়না বেগম বিয়ে করেননি, ভাইয়ের সংসারে ছিলেন। কিন্তু ভাইয়ের স্ত্রীর অবহেলায় তার ঠাঁই হয় রাস্তায়। পরবর্তীতে আশ্রয় শান্তি নিবাসে। আয়শাও এমনই এক নিঃসঙ্গ নারী, যার কেউ নেই। ঈদের দিন তারা একে অপরের সঙ্গেই ভাগ করে নিয়েছেন আনন্দ, স্মৃতি আর কান্না।

শান্তি নিবাসে ঈদের আয়োজন: যত্নে থাকা, কিন্তু সন্তানের অভাব পূরণ হয় না

শান্তি নিবাসে ঈদের দিন তাদের জন্য উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সকালের খাবারে ছিল খিচুড়ি, সেমাই ও ডিম। দুপুরে পোলাও, গরু ও খাসির মাংস, রোস্ট ও মিষ্টি, এবং রাতেও ছিল বিশেষ খাবার। নতুন পোশাকও দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই যত্নেও পূরণ হয় না সন্তানের অভাব।

সমাজসেবা অধিদফতরের ভূমিকা: যত্নে রাখা হচ্ছে পরিবারহীন মানুষগুলোকে

ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এ এস এম আলী আহসান জানান, শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১০ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন গুরুতর অসুস্থ, যাদের চিকিৎসা এখান থেকেই দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “তাদের যেন কখনো মনে না হয় তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সেই চেষ্টাই আমরা করি।”

শেষ কথা: ঈদে একাকীত্ব নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা ও দায়িত্ব

শান্তি নিবাসের এই গল্পগুলো কেবল কিছু মানুষের নয়, বরং আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতা। যারা একদিন আমাদের ভালোবেসে লালন করেছিলেন, আজ তারা একাকী। আমরা কি পারি না এই ঈদের দিনে একটিবার হলেও খোঁজ নিতে তাদের?

ঈদের দিনও খোঁজ নেয়নি সন্তানরা, ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে নিঃসঙ্গ বাবা-মা

আপডেট সময় : ০১:২৫:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ জুন ২০২৫

ঈদুল আজহার দিন, যখন সবাই পরিবার নিয়ে ঈদের আনন্দে মেতে ওঠে, তখন ফরিদপুরের শান্তি নিবাসে কাটছে নিঃসঙ্গতা আর কান্নার মধ্যে। এই বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া ১৫ জন মা-বাবা এবারও সন্তানদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত। অথচ এই সন্তানদের জন্যই তারা ত্যাগ করেছেন জীবনের সব সুখ।

বকুল বেগমের জীবন: সৎ মায়ের গ্লানি নিয়ে ঈদের সকাল

ষাটোর্ধ্ব বকুল বেগম বর্তমানে অসুস্থ অবস্থায় শান্তি নিবাসে পড়ে আছেন। নিজে খেতে পারেন না, কথা বলতেও কষ্ট হয়। জীবনে এক সময় স্বামীর আগের পক্ষের সন্তানদের ভালোবেসে বড় করেছেন। কিন্তু সৎ মায়ের কপাল বুঝি এমনই হয়—বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। বহু ঘুরে আশ্রয় মেলে শান্তি নিবাসে। এখন তিনি নিঃসঙ্গ, কিন্তু তবুও সন্তানদের জন্য দোয়া করেন।

লতিফ শিকদারের নিরব কান্না: সন্তানেরা যেন ভুলেই গেছে

নড়াইলের লতিফ শিকদার একসময় দর্জির কাজ করে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অসুস্থ হয়ে পড়লে সন্তানরা তাকে হাসপাতালে রেখে আর ফিরে তাকায়নি। আজ তিনি কথা বলতে পারেন না, চোখে জল নিয়েই ঈদের দিনটা কেটেছে শান্তি নিবাসে।

সাজ্জাদ শেখ: সম্পত্তির বিনিময়ে একা হয়ে যাওয়া এক বাবা

একসময় সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন সাজ্জাদ শেখ। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দিলে তারাই তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। দ্বিতীয় বিয়েতেও একই পরিণতি। বর্তমানে শান্তি নিবাসেই কাটছে তার ৮ বছরের নিঃসঙ্গ জীবন। বলেন, “ছেলে মন্ত্রী হলেও আর তার কাছে যাবো না, এখানে ভালো আছি।”

ময়না বেগম ও আয়শা: ভাইয়ের অবহেলা আর নিঃসঙ্গতার গল্প

ময়না বেগম বিয়ে করেননি, ভাইয়ের সংসারে ছিলেন। কিন্তু ভাইয়ের স্ত্রীর অবহেলায় তার ঠাঁই হয় রাস্তায়। পরবর্তীতে আশ্রয় শান্তি নিবাসে। আয়শাও এমনই এক নিঃসঙ্গ নারী, যার কেউ নেই। ঈদের দিন তারা একে অপরের সঙ্গেই ভাগ করে নিয়েছেন আনন্দ, স্মৃতি আর কান্না।

শান্তি নিবাসে ঈদের আয়োজন: যত্নে থাকা, কিন্তু সন্তানের অভাব পূরণ হয় না

শান্তি নিবাসে ঈদের দিন তাদের জন্য উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। সকালের খাবারে ছিল খিচুড়ি, সেমাই ও ডিম। দুপুরে পোলাও, গরু ও খাসির মাংস, রোস্ট ও মিষ্টি, এবং রাতেও ছিল বিশেষ খাবার। নতুন পোশাকও দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই যত্নেও পূরণ হয় না সন্তানের অভাব।

সমাজসেবা অধিদফতরের ভূমিকা: যত্নে রাখা হচ্ছে পরিবারহীন মানুষগুলোকে

ফরিদপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক এ এস এম আলী আহসান জানান, শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১০ জন নারী ও ৫ জন পুরুষ রয়েছেন। এর মধ্যে তিনজন গুরুতর অসুস্থ, যাদের চিকিৎসা এখান থেকেই দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “তাদের যেন কখনো মনে না হয় তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সেই চেষ্টাই আমরা করি।”

শেষ কথা: ঈদে একাকীত্ব নয়, প্রয়োজন ভালোবাসা ও দায়িত্ব

শান্তি নিবাসের এই গল্পগুলো কেবল কিছু মানুষের নয়, বরং আমাদের সমাজের এক কঠিন বাস্তবতা। যারা একদিন আমাদের ভালোবেসে লালন করেছিলেন, আজ তারা একাকী। আমরা কি পারি না এই ঈদের দিনে একটিবার হলেও খোঁজ নিতে তাদের?