বিগত সরকারের লুটপাট ও বর্তমানের ভুল নীতি: ধ্বংসের মুখে অর্থনীতি

- আপডেট সময় : ১২:৩০:৩৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
- / 20
স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও লাগামহীন অর্থপাচার এবং পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত দেড় বছরের ভুল নীতির যৌথ শিকারে পরিণত হয়েছে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি। ফলে দেশের অর্থনীতি এখন এক গভীর ও অন্ধকার সংকটে নিমজ্জিত। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তীব্র মন্দায় আক্রান্ত শিল্প খাতে ঋণের চাহিদা তলানিতে নামায় বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি এখন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। থমকে গেছে নতুন বিনিয়োগ, কমছে উৎপাদন এবং হু হু করে বাড়ছে বেকারত্ব।
সরকার বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিলেও, রফতানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকে আন্তর্জাতিক কার্যাদেশ (অর্ডার) না থাকায় বিদ্যমান কারখানাগুলো প্রতিদিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। যার ফলে দেশজুড়ে শ্রমিক অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠছে।
বকেয়া বেতন ও ছাঁটাইয়ের রাজপথ অবরোধ:
গতকালও বকেয়া বেতন-ভাতার দাবিতে রাজধানী ঢাকার সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনে নামেন নাসা গ্রুপের মালিকানাধীন নাসা নিট লিমিটেড, নাসা অ্যাপারেলস লিমিটেড ও ওয়েস্টার্ন ড্রেসেস লিমিটেডের শত শত শ্রমিক। শুধু ঢাকা নয়, ঈদুল আজহার ছুটি শেষে কারখানা খোলার পরপরই সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গণ-ছাঁটাইয়ের ঘটনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে আল-মুসলিম গ্রুপে, যেখানে তিনটি কারখানা থেকে একযোগে ১ হাজার ৮৬৮ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই দেশের ৭৯টি পোশাক কারখানা থেকে ৭ হাজার ৭৮৪ জন শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা আশুলিয়ায়, যেখানে ৪ হাজার ৯৭২ জন চাকরি হারিয়েছেন। পোশাক সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে খুব শিগগিরই দেশের আরেকটি বড় শিল্প গ্রুপ প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করতে পারে।
রেমিট্যান্সে বড় ধস ও রিজার্ভের ওপর চাপ:
অর্থনীতির ক্ষত আরও গভীর করে চলতি জুন মাসের প্রথম ছয় দিনেই প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে ২০.৭৮ শতাংশের বিশাল পতন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে Scan জুন পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৮৩.৩৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৮৬২.৫৯ মিলিয়ন ডলার। রেমিট্যান্সের এই আকস্মিক পতন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তীব্র ও নতুন চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
ব্যবসায়ীদের নাভিশ্বাস ও বিশেষজ্ঞদের হুঁশিয়ারি:
উচ্চ সুদহার (১৪ থেকে ১৭ শতাংশ), দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানি সংকট, পাহাড়সম খেলাপি ঋণ এবং কর নীতি—এই চতুর্মুখী আক্রমণে দেশের বেসরকারি খাত পুরোপুরি নাস্তানাবুদ। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, “বেসরকারি খাত রুগ্ন হয়ে পড়লে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। সরকারের মূল দায়িত্ব বিনিয়োগবান্ধব আবহাওয়া তৈরি করা।” ওদিকে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, কার্যাদেশ প্রতিনিয়ত কমছে এবং অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের কাছে একটি বিশেষ কার্যপত্র জমা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
শিল্প খাতের মন্দার নেপথ্য কারণ:
শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ঋণের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখার কারণে উৎপাদন ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে। ডলার সংকটে কাঁচামাল আমদানির এলসি খোলা যাচ্ছে না। গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
যদিও পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে ২৫ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সতর্ক করেছেন যে, ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট ও সুশাসনের অভাব দূর না করে কেবল টাকা ঢাললে মূল্যস্ফীতি (যা ইতিমধ্যে আবার ১০ শতাংশের কাছাকাছি) আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়তে পারে।

























