ঢাকা ১০:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

০-২ থেকে ৩-২! মিশরের বিরুদ্ধে মেসির আর্জেন্টিনার রূপকথা

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৪৪:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
  • / 85

একে কি শুধুই ফুটবল ম্যাচ বলা চলে? নাকি এক চরম স্নায়ুক্ষয়ী নাটক, যার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়ার মতো রোমাঞ্চ! ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জেতা যায়—তা-ও আবার বিশ্বকাপের নকআউটের মতো মরণ-বাঁচন মঞ্চে? বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আজ যেন ফুটবল ঈশ্বরের নিজের হাতে লেখা এক অবিশ্বাস্য রূপকথার গল্প উপহার দিল। মিশরের ফেরাউনদের তৈরি করা খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ গোলের মহাকাব্যিক জয় ছিনিয়ে নিল লিওনেল মেসির দল। আর এই জাদুকরী কামব্যাকেই নিশ্চিত হয়ে গেল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।

প্রথমার্ধে পথ হারানো আলবিসেলেস্তে ও মেসির পেনাল্টি ট্র্যাজেডি

ম্যাচের শুরু থেকেই চেনা ছন্দে ছিল না স্কালোনির আর্জেন্টিনা। প্রথম পাঁচ মিনিটেই পজিশনের ভুলে দু-দুবার বল হারিয়ে মিশরকে আক্রমণের লাইসেন্স দিয়ে বসে তারা। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো; ম্যাচের ১৪ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে উড়ে আসা বলে নিখুঁত মাথা ছুঁইয়ে মিশরকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন ইয়াসির ইব্রাহিম।

পাঁচ মিনিট পরেই ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সে নিকলাস তালিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিকে স্বয়ং লিওনেল মেসি! কিন্তু গ্যালারির কোটি কোটি চোখকে স্তব্ধ করে দিয়ে মেসির শট রুখে দেন মিশরের প্রাচীর হয়ে ওঠা গোলরক্ষক মোহাম্মদ শোবেইর। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল এলএমটেনের টানা দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস! এরপর ম্যাক অ্যালিস্টার আর আলভারেজের শটও বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে রুখে দেন শোবেইর। এমনকি মেসির একটি ফ্রি-কিকও বারে লেগে ফিরে এলে প্রথমার্ধ শেষ হয় মিশরের ১-০ লিডেই।

জিকোর জোড়া ধাক্কা ও খাদের কিনারায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা

দ্বিতীয়ার্ধের গল্পটা প্রথমার্ধের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিল আলবিসেলেস্তেদের জন্য। ৫৮ মিনিটে মিশরের মুস্তাফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআর (VAR)-এর চুলচেরা বিশ্লেষণে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করার কারণে গোলটি বাতিল হয়।

কিন্তু ভাগ্যদেবীর সেই সতর্কবার্তা কানে তোলেনি আর্জেন্টিনা রক্ষণভাগ। ৬৭ মিনিটে এক বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সেই মুস্তাফা জিকোই আর কোনো ভুল করেননি। বল জালে জড়িয়ে মিশরকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন তিনি। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ৭০ মিনিট। আর্জেন্টিনার আকাশ তখন বিদায়ের কালো মেঘে ঢেকে গেছে, কোটি ভক্তের চোখে তখন জল।

রোমেরো-মেসি-এনজো: ১৩ মিনিটের সেই মহাকাব্যিক সুনামি

যখন সব শেষ মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই জেগে উঠল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অহংকার। ৭৯ মিনিটে লিওনেল মেসির এক মাপা ক্রস থেকে চিতার মতো লাফিয়ে বুলেট গতির হেডারে গোল করেন ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (২-১)। মিশরের গোলরক্ষক শোবেইরের হাতে বল লাগলেও তা জালে জড়ানো আটকাতে পারেনি। এই এক গোলেই যেন প্রাণ ফিরে পায় নীল-সাদা শিবির।

এর ঠিক ৪ মিনিট পর, অর্থাৎ ৮৩ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ভেতর জটলার মধ্য থেকে জাদুকরী এক শট নেন মেসি। শোবেইরের হাত ছুঁয়ে বল যখন গোললাইন অতিক্রম করল, তখন স্টেডিয়াম জুড়ে শুধুই গর্জন। ২-২ সমতায় ম্যাচ!

নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল।

যোগ করা সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) কাউন্টার অ্যাটাক থেকে লাউতারো মার্তিনেজের এক নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে জয়সূচক গোলটি করেন মাঝমাঠের সেনানি এনজো ফার্নান্দেজ। ২-০ থেকে স্কোরবোর্ড তখন ৩-২!

হতাশার নরক থেকে এক লহমায় আনন্দের স্বর্গে আরোহণ করল আর্জেন্টিনা। মিশরের লড়াকু ফুটবলকে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান ধরে রেখেই মাঠ ছাড়ে মেসি বাহিনী। এই জয় শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নয়, এই জয় প্রমাণ করল—বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খাঁচায় বন্দি করা গেলেও তাদের ভেতরের সিংহকে কখনও ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না।

০-২ থেকে ৩-২! মিশরের বিরুদ্ধে মেসির আর্জেন্টিনার রূপকথা

আপডেট সময় : ১২:৪৪:২২ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

একে কি শুধুই ফুটবল ম্যাচ বলা চলে? নাকি এক চরম স্নায়ুক্ষয়ী নাটক, যার পরতে পরতে লুকিয়ে ছিল হৃৎস্পন্দন থমকে যাওয়ার মতো রোমাঞ্চ! ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও ম্যাচ জেতা যায়—তা-ও আবার বিশ্বকাপের নকআউটের মতো মরণ-বাঁচন মঞ্চে? বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা আজ যেন ফুটবল ঈশ্বরের নিজের হাতে লেখা এক অবিশ্বাস্য রূপকথার গল্প উপহার দিল। মিশরের ফেরাউনদের তৈরি করা খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ গোলের মহাকাব্যিক জয় ছিনিয়ে নিল লিওনেল মেসির দল। আর এই জাদুকরী কামব্যাকেই নিশ্চিত হয়ে গেল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট।

প্রথমার্ধে পথ হারানো আলবিসেলেস্তে ও মেসির পেনাল্টি ট্র্যাজেডি

ম্যাচের শুরু থেকেই চেনা ছন্দে ছিল না স্কালোনির আর্জেন্টিনা। প্রথম পাঁচ মিনিটেই পজিশনের ভুলে দু-দুবার বল হারিয়ে মিশরকে আক্রমণের লাইসেন্স দিয়ে বসে তারা। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো; ম্যাচের ১৪ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে উড়ে আসা বলে নিখুঁত মাথা ছুঁইয়ে মিশরকে ১-০ গোলে এগিয়ে দেন ইয়াসির ইব্রাহিম।

পাঁচ মিনিট পরেই ম্যাচে ফেরার সুবর্ণ সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সে নিকলাস তালিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। স্পট কিকে স্বয়ং লিওনেল মেসি! কিন্তু গ্যালারির কোটি কোটি চোখকে স্তব্ধ করে দিয়ে মেসির শট রুখে দেন মিশরের প্রাচীর হয়ে ওঠা গোলরক্ষক মোহাম্মদ শোবেইর। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল এলএমটেনের টানা দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস! এরপর ম্যাক অ্যালিস্টার আর আলভারেজের শটও বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে রুখে দেন শোবেইর। এমনকি মেসির একটি ফ্রি-কিকও বারে লেগে ফিরে এলে প্রথমার্ধ শেষ হয় মিশরের ১-০ লিডেই।

জিকোর জোড়া ধাক্কা ও খাদের কিনারায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা

দ্বিতীয়ার্ধের গল্পটা প্রথমার্ধের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিচ্ছিল আলবিসেলেস্তেদের জন্য। ৫৮ মিনিটে মিশরের মুস্তাফা জিকো বল জালে পাঠালেও ভিএআর (VAR)-এর চুলচেরা বিশ্লেষণে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে ফাউল করার কারণে গোলটি বাতিল হয়।

কিন্তু ভাগ্যদেবীর সেই সতর্কবার্তা কানে তোলেনি আর্জেন্টিনা রক্ষণভাগ। ৬৭ মিনিটে এক বিধ্বংসী কাউন্টার অ্যাটাক থেকে সেই মুস্তাফা জিকোই আর কোনো ভুল করেননি। বল জালে জড়িয়ে মিশরকে ২-০ গোলে এগিয়ে দেন তিনি। ঘড়ির কাঁটায় তখন প্রায় ৭০ মিনিট। আর্জেন্টিনার আকাশ তখন বিদায়ের কালো মেঘে ঢেকে গেছে, কোটি ভক্তের চোখে তখন জল।

রোমেরো-মেসি-এনজো: ১৩ মিনিটের সেই মহাকাব্যিক সুনামি

যখন সব শেষ মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই জেগে উঠল বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের অহংকার। ৭৯ মিনিটে লিওনেল মেসির এক মাপা ক্রস থেকে চিতার মতো লাফিয়ে বুলেট গতির হেডারে গোল করেন ডিফেন্ডার ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো (২-১)। মিশরের গোলরক্ষক শোবেইরের হাতে বল লাগলেও তা জালে জড়ানো আটকাতে পারেনি। এই এক গোলেই যেন প্রাণ ফিরে পায় নীল-সাদা শিবির।

এর ঠিক ৪ মিনিট পর, অর্থাৎ ৮৩ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ভেতর জটলার মধ্য থেকে জাদুকরী এক শট নেন মেসি। শোবেইরের হাত ছুঁয়ে বল যখন গোললাইন অতিক্রম করল, তখন স্টেডিয়াম জুড়ে শুধুই গর্জন। ২-২ সমতায় ম্যাচ!

নাটকের শেষ অঙ্ক তখনও বাকি ছিল।

যোগ করা সময়ে (ইঞ্জুরি টাইম) কাউন্টার অ্যাটাক থেকে লাউতারো মার্তিনেজের এক নিখুঁত ক্রসে মাথা ছুঁইয়ে জয়সূচক গোলটি করেন মাঝমাঠের সেনানি এনজো ফার্নান্দেজ। ২-০ থেকে স্কোরবোর্ড তখন ৩-২!

হতাশার নরক থেকে এক লহমায় আনন্দের স্বর্গে আরোহণ করল আর্জেন্টিনা। মিশরের লড়াকু ফুটবলকে স্তব্ধ করে দিয়ে শেষ পর্যন্ত এই ব্যবধান ধরে রেখেই মাঠ ছাড়ে মেসি বাহিনী। এই জয় শুধু কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নয়, এই জয় প্রমাণ করল—বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের খাঁচায় বন্দি করা গেলেও তাদের ভেতরের সিংহকে কখনও ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না।