ঢাকা ০৭:১২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৭ বিষয়ে ফেল করেও ২০ বছর শিক্ষকতা: তবুও জাল সনদে বহাল শিক্ষক

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৯:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫
  • / 324

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাটখুজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাজু ডিগ্রি পরীক্ষায় ৭টি বিষয়ে ফেল করেও জাল সনদে শিক্ষক হিসেবে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রফিকুল ইসলাম এই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তিনি ডিগ্রিতে সাতটি বিষয়ে ফেল করলেও জাল সনদে নিজেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ দেখিয়েছেন। এমনকি মনোবিজ্ঞানে সর্বনিম্ন ৭ এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যায় মাত্র ৮ পেয়েছিলেন। ইংরেজিতে তার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২০, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান-২-এ ৩৩ পেয়ে কোনো রকমে পাশ করেছিলেন। এই ফলাফলের প্রমাণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের আর্কাইভে এখনো বিদ্যমান।

দীর্ঘদিন ধরে অধরা অভিযুক্ত শিক্ষক

অভিযোগ উঠেছে, রফিকুল ইসলাম যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল, সেই দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে তিনি এমপিওভুক্ত হয়ে সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করে আসছেন।

বারবার অভিযোগ, তবুও তদন্তে উদাসীনতা

সর্বশেষ গত ৭ মে হাটখুজিপুর গ্রামের আবু রায়হান নামের এক ব্যক্তি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার (মাউশি) রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের কাছে রফিকুল ইসলামের জাল সনদের ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত এই অভিযোগের তদন্তও শুরু হয়নি। এর আগে গত বছরের ১০ অক্টোবর একই অভিযোগ জেলা প্রশাসকের কাছে করা হয়েছিল, তখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রাজশাহীর মোহনপুর ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষ একাধিক প্রত্যয়নপত্রে নিশ্চিত করেছে যে রফিকুল ইসলাম বিএ (পাশ) পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২২ নভেম্বর কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আনিসুর রহমান একটি প্রত্যয়নপত্রে এই তথ্য জানান। এমনকি চলতি বছরের ২১ এপ্রিল বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ মো. বারী ইয়ামিন বখতিয়ারও প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, ফলাফল শিটে রফিকুল ইসলামের ফেল আছে এবং টেবুলেশন শিটে তার ফলাফল নেই।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য

হাটখুজিপুর গ্রামের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, “রফিকুল ইসলাম নামের ওই শিক্ষকের ডিগ্রি পাশের সনদ ভুয়া, এতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রামের সবাই জানে। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তা জানি না। অর্থের কাছে তারা অন্ধ। তা না হলে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন?”

হাটখুজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসাহাক আলী জানান, “এসব অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছিল; কিন্তু আমার কাছে কেউ তদন্ত চায়নি। আমি তদন্তও করিনি। এসব বলতে পারব না।”

অভিযুক্ত শিক্ষক ও মাউশি’র প্রতিক্রিয়া

অভিযুক্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাজু বলেছেন, “এসব অভিযোগের ব্যাপারে আমি কাগজপত্র দিয়েছি। সব মিটমাট হয়ে গেছে। কোনো সমস্যা নেই। আমি আর কথা বলব না।”

তবে মাউশির রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহা. আবদুর রশিদ অভিযোগটি সম্পর্কে এখনো জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি তো নতুন এসেছি। এটা এখনো দেখিনি। দেখি অভিযোগটা খুঁজে বের করে- এ ব্যাপারে আমরা তদন্ত শুরু করব।”

এই ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে।

৭ বিষয়ে ফেল করেও ২০ বছর শিক্ষকতা: তবুও জাল সনদে বহাল শিক্ষক

আপডেট সময় : ০৯:৫৯:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২ জুলাই ২০২৫

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার হাটখুজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাজু ডিগ্রি পরীক্ষায় ৭টি বিষয়ে ফেল করেও জাল সনদে শিক্ষক হিসেবে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে চাকরি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ উঠলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।

২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রফিকুল ইসলাম এই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তিনি ডিগ্রিতে সাতটি বিষয়ে ফেল করলেও জাল সনদে নিজেকে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ দেখিয়েছেন। এমনকি মনোবিজ্ঞানে সর্বনিম্ন ৭ এবং ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যায় মাত্র ৮ পেয়েছিলেন। ইংরেজিতে তার প্রাপ্ত নম্বর ছিল ২০, আর রাষ্ট্রবিজ্ঞান-২-এ ৩৩ পেয়ে কোনো রকমে পাশ করেছিলেন। এই ফলাফলের প্রমাণ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলাফলের আর্কাইভে এখনো বিদ্যমান।

দীর্ঘদিন ধরে অধরা অভিযুক্ত শিক্ষক

অভিযোগ উঠেছে, রফিকুল ইসলাম যখন যে দল ক্ষমতায় ছিল, সেই দলের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলেছেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা বিএনপির এক শীর্ষ নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগকারীদের দাবি। ২০১৮ সালের জুলাই মাস থেকে তিনি এমপিওভুক্ত হয়ে সরকারি বেতন-ভাতাও উত্তোলন করে আসছেন।

বারবার অভিযোগ, তবুও তদন্তে উদাসীনতা

সর্বশেষ গত ৭ মে হাটখুজিপুর গ্রামের আবু রায়হান নামের এক ব্যক্তি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার (মাউশি) রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালকের কাছে রফিকুল ইসলামের জাল সনদের ব্যাপারে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত এই অভিযোগের তদন্তও শুরু হয়নি। এর আগে গত বছরের ১০ অক্টোবর একই অভিযোগ জেলা প্রশাসকের কাছে করা হয়েছিল, তখনও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রাজশাহীর মোহনপুর ডিগ্রি কলেজ কর্তৃপক্ষ একাধিক প্রত্যয়নপত্রে নিশ্চিত করেছে যে রফিকুল ইসলাম বিএ (পাশ) পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছিলেন। ২০০৪ সালের ২২ নভেম্বর কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আনিসুর রহমান একটি প্রত্যয়নপত্রে এই তথ্য জানান। এমনকি চলতি বছরের ২১ এপ্রিল বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শেখ মো. বারী ইয়ামিন বখতিয়ারও প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখ করেছেন যে, ফলাফল শিটে রফিকুল ইসলামের ফেল আছে এবং টেবুলেশন শিটে তার ফলাফল নেই।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রধান শিক্ষকের বক্তব্য

হাটখুজিপুর গ্রামের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, “রফিকুল ইসলাম নামের ওই শিক্ষকের ডিগ্রি পাশের সনদ ভুয়া, এতে কোনো সন্দেহ নেই। গ্রামের সবাই জানে। প্রশাসন ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন, তা জানি না। অর্থের কাছে তারা অন্ধ। তা না হলে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন?”

হাটখুজিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইসাহাক আলী জানান, “এসব অভিযোগ বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছিল; কিন্তু আমার কাছে কেউ তদন্ত চায়নি। আমি তদন্তও করিনি। এসব বলতে পারব না।”

অভিযুক্ত শিক্ষক ও মাউশি’র প্রতিক্রিয়া

অভিযুক্ত শিক্ষক রফিকুল ইসলাম সাজু বলেছেন, “এসব অভিযোগের ব্যাপারে আমি কাগজপত্র দিয়েছি। সব মিটমাট হয়ে গেছে। কোনো সমস্যা নেই। আমি আর কথা বলব না।”

তবে মাউশির রাজশাহীর ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোহা. আবদুর রশিদ অভিযোগটি সম্পর্কে এখনো জানেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি তো নতুন এসেছি। এটা এখনো দেখিনি। দেখি অভিযোগটা খুঁজে বের করে- এ ব্যাপারে আমরা তদন্ত শুরু করব।”

এই ঘটনা শিক্ষা প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তুলেছে।