ফরিদপুরে দুর্নীতিবাজ তহশিলদার: ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া মিলছে না সেবা
- আপডেট সময় : ০১:১৬:০৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৪ জুলাই ২০২৫
- / 631
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মিউটেশনসহ বিভিন্ন ভূমি সেবা পেতে গ্রাহকদের এক থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার জহিরুল হক এসব অনিয়মের মূল হোতা বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। শুধু চতুল নয়, বোয়ালমারীর অন্যান্য ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও একই চিত্র দেখা গেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।
ঘুষের রাজত্ব: প্রতিটি ধাপে অর্থ আদায়
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চতুল ইউনিয়ন ভূমি অফিসে জমির নামজারি, খতিয়ান দেখানো, তদন্ত প্রতিবেদন, এমনকি খাজনা আদায়ের প্রতিটি ধাপে ধাপে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিলে কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়, না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তহশিল অফিসের পাশে সেলিম মুন্সি, পান্নু শেখ, জাহিদ ঠাকুর, সাইফার হোসেনের মতো কিছু দোকান রয়েছে। এসব দোকানে ভূমি সংশ্লিষ্ট অনলাইন কাজ করা হয় এবং এখান থেকেই দালালরা গ্রাহকদের তহশিলদারদের কাছে নিয়ে যায়। যেখানে একটি মিউটেশনের সরকারি চার্জ মাত্র ১১৭০ টাকা, সেখানে প্রকারভেদে দুই হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী ও জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ
জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আহসান হাবিব হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ, এক কথায় ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়াচড়া করে না, এমনকি এসিল্যান্ড অফিসেও যায় না। তার দাবি, কমপক্ষে ৪-৫ হাজার টাকা দিলে জমির মিউটেশন কাজ হয়। তিনি জানান, চতুল ইউনিয়নবাসী তহশিলদার জহিরুল হকের কাছে কাজ করতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন এবং তারা সবার স্বাক্ষর নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
চতুল বাইখীর গ্রামের নিয়ামুল হক ফয়সাল ও বাইখীর চৌরাস্তা এলাকার মিলন শেখ অভিযোগ করে বলেন, তহশিলদার জহিরুল হক তার নিয়ন্ত্রণে কয়েকজন দালাল রেখে সেবা গ্রহীতাদের সঙ্গে কথা বলান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি নিজেই ‘অফিসের খরচ’ বলে অতিরিক্ত অর্থ নেন।
এহরামুজ্জামান নামে এক সেবাপ্রত্যাশী জানান, তার বাবার নামে রেকর্ড সম্পত্তি নামজারি করতে চতুল ভূমি অফিসে বারবার গিয়েও কোনো কাজ হয়নি। পরে তহশিলদার ‘অফিস খরচের’ কথা বললে তিনি বাধ্য হয়ে এক হাজার টাকা দিয়ে কাজটি করিয়েছেন।
সৌদি প্রবাসী নাজমুল হোসেন গুনবহা ইউনিয়নের চাপলডাঙ্গা থেকে মিউটেশন করতে এসে বলেন, ৮ শতাংশ জমির মিউটেশন করতে সরকারি জমার বাইরে তার কাছে ১০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। ১০ হাজার টাকা দিলে সাত দিনের মধ্যে কাজটি করে দেওয়া হবে, অন্যথায় দিনের পর দিন ঘুরতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোয়ালমারী বাজারের একজন কম্পিউটার দোকান মালিক জাগো নিউজকে বলেন, তহশিলদার জহিরুল হকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শতভাগ সঠিক। তিনি আচার ব্যবহারে ভালো নন এবং ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ করেন না।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
এ বিষয়ে অভিযুক্ত চতুল ভূমি অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত তহশিলদার জহিরুল হকের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
চতুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ইউনিয়নবাসীর অনেকের কাছ থেকেই তহশিলদার সম্পর্কে বিভিন্ন রকম অভিযোগ ও খবর পেয়েছেন।
বোয়ালমারী সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনলাইন সার্ভিস চালু হওয়ার ফলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি কমেছে, তবে অনেকেই এই বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতে না পারার কারণে দালালের খপ্পরে পড়েন। তখন তাদের অতিরিক্ত অর্থ নষ্ট হয়। তিনি সরাসরি এসিল্যান্ড অফিসে এসে সেবা গ্রহণের পরামর্শ দেন।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভির হাসান চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ভুক্তভোগীদের লিখিত কোনো অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।





















