ঢাকা ০১:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩১ মে ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিপদ ঘরের ভেতরেই: সাবেক পুলিশ-সেনাসদস্যরা জড়াচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধে

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:৩৮:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫
  • / 323

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কিছু সদস্য, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত সদস্য এবং তাদের সোর্সরা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। র‍্যাব, ডিবি, এমনকি সেনাসদস্য পরিচয়ে তারা ছিনতাই, অপহরণ, অর্থ আদায় ও লুটের মতো গুরুতর অপরাধ করছে। অনেক প্রতারকও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

অপরাধের পরিসংখ্যান ও জড়িতদের ধরন

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত শুধু রাজধানীতেই ৫৫টি ডাকাতি এবং প্রায় সাড়ে ৩০০ ছিনতাইয়ের মামলা রেকর্ড হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, এর মধ্যে অন্তত ৬টি ডাকাতির ঘটনায় ৩৮ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত সদস্য ও তাদের সোর্সরা রয়েছেন। এই ৩৮ জনের মধ্যে ২৬ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্রমতে, শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব চক্রের সঙ্গে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন ইউনিটের চাকরিচ্যুত সদস্যরা যুক্ত হচ্ছেন। যেহেতু তারা এই বাহিনীগুলোর সাবেক সদস্য, তাই একজন পুলিশ বা র‍্যাব সদস্য কীভাবে আচরণ করেন, তাদের কার্যপদ্ধতি কেমন হয়, সে সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা রয়েছে।

অপরাধের কৌশল ও সাম্প্রতিক ঘটনা

প্রতারকরা ডিবি বা র‍্যাবের জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ এবং কখনো কখনো আগ্নেয়াস্ত্রও (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া) ব্যবহার করে। এতদিন ডিবি বা র‍্যাবের পরিচয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের পোশাকেও প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভোরে বনানী এলাকায় ডিবি পরিচয়ে এক লন্ডন প্রবাসীর গাড়ি আটকে তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০ জুলাই বিকেলে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় বোরহান উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির বাসায় সেনাবাহিনীর পরিচয়ে একটি চক্র হানা দেয়। তারা একটি প্রাইভেটকারে ওই বাসায় গিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যাওয়ার সময় এনডিসি চেকপোস্টের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়। পরে তাদের পল্লবী থানায় হস্তান্তর করা হয়।

পল্লবী থানার ওসি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের মধ্যে দুজন সাবেক সেনাসদস্য রয়েছেন: একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট ফিরোজ ইফতেখার এবং অপরজন অবসরপ্রাপ্ত কর্পোরাল মুকুল। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, আটক ফিরোজ ইফতেখার ‘জাস্টিস ফর কমরেডস’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য, আর কর্পোরাল মুকুল ‘সহযোদ্ধা’ নামের একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত, যা সেনাবাহিনী থেকে বিতাড়িত বা অসন্তুষ্টদের নিয়ে গঠিত।

এর আগে গত ১৪ জুন উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে র‍্যাবের পোশাকে নগদ ডিস্ট্রিবিউটরের দুই কর্মীর কাছ থেকে এক কোটি ৮ লাখ টাকা ভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে পরে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২২ লাখ টাকা উদ্ধার হয়। এই ডাকাতিতে চাকরিচ্যুত পুলিশ ও সেনাসদস্যরা জড়িত ছিলেন।

এছাড়াও, গত ২৬ মার্চ ভোরে যৌথ বাহিনী সেজে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে ৩৬ লাখ টাকা এবং স্বর্ণালংকার লুট করা হয়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ১১ সদস্য জড়িত ছিলেন। গত ১১ জানুয়ারি গুলশানের একটি বাসা থেকে যৌথ বাহিনীর পরিচয়ে ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৩৪ লাখ টাকা লুট করা হয়েছিল। একই মাসে গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের উল্টো পাশে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর এক কোটি টাকা লুট হয়। এই দুটি ডাকাতির ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

গত বছরের ১২ অক্টোবর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনী সেজে একটি বাসা থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৭৫ লাখ টাকা লুট করা হয়। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১১ সদস্য ও তাদের সোর্সের নাম আসে, যাদের মধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের বক্তব্য

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও চ্যালেঞ্জের। এমন ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি, বহু আগে থেকেই ঘটছে। তবে গত ১০ মাসে এমন অপরাধের সংখ্যা বেশি। তিনি এই অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, “আমরা অপরাধীকে অপরাধী হিসাবেই গণ্য করি। অপরাধী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি আরও জানান, বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা, তাও নজরদারি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ অভিযানে গেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে কাছের থানায় জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বিপদ ঘরের ভেতরেই: সাবেক পুলিশ-সেনাসদস্যরা জড়াচ্ছে সংঘবদ্ধ অপরাধে

আপডেট সময় : ০১:৩৮:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৩০ জুলাই ২০২৫

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কিছু সদস্য, বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত সদস্য এবং তাদের সোর্সরা অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়ছে। র‍্যাব, ডিবি, এমনকি সেনাসদস্য পরিচয়ে তারা ছিনতাই, অপহরণ, অর্থ আদায় ও লুটের মতো গুরুতর অপরাধ করছে। অনেক প্রতারকও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সেজে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে, যা জনমনে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

অপরাধের পরিসংখ্যান ও জড়িতদের ধরন

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত শুধু রাজধানীতেই ৫৫টি ডাকাতি এবং প্রায় সাড়ে ৩০০ ছিনতাইয়ের মামলা রেকর্ড হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, এর মধ্যে অন্তত ৬টি ডাকাতির ঘটনায় ৩৮ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের অবসরপ্রাপ্ত, চাকরিচ্যুত সদস্য ও তাদের সোর্সরা রয়েছেন। এই ৩৮ জনের মধ্যে ২৬ জনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সূত্রমতে, শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ডাকাতি, ছিনতাই ও অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে। এসব চক্রের সঙ্গে সেনাবাহিনী, পুলিশ, বিজিবিসহ বিভিন্ন ইউনিটের চাকরিচ্যুত সদস্যরা যুক্ত হচ্ছেন। যেহেতু তারা এই বাহিনীগুলোর সাবেক সদস্য, তাই একজন পুলিশ বা র‍্যাব সদস্য কীভাবে আচরণ করেন, তাদের কার্যপদ্ধতি কেমন হয়, সে সম্পর্কে তাদের ভালো ধারণা রয়েছে।

অপরাধের কৌশল ও সাম্প্রতিক ঘটনা

প্রতারকরা ডিবি বা র‍্যাবের জ্যাকেট, ওয়াকিটকি, হ্যান্ডকাফ এবং কখনো কখনো আগ্নেয়াস্ত্রও (বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভুয়া) ব্যবহার করে। এতদিন ডিবি বা র‍্যাবের পরিচয়ে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও, সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের পোশাকেও প্রায়ই ডাকাতির ঘটনা ঘটছে।

সর্বশেষ গত মঙ্গলবার ভোরে বনানী এলাকায় ডিবি পরিচয়ে এক লন্ডন প্রবাসীর গাড়ি আটকে তার সর্বস্ব ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০ জুলাই বিকেলে মিরপুর ডিওএইচএস এলাকায় বোরহান উদ্দিন নামের এক ব্যক্তির বাসায় সেনাবাহিনীর পরিচয়ে একটি চক্র হানা দেয়। তারা একটি প্রাইভেটকারে ওই বাসায় গিয়ে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যাওয়ার সময় এনডিসি চেকপোস্টের কাছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়। পরে তাদের পল্লবী থানায় হস্তান্তর করা হয়।

পল্লবী থানার ওসি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের মধ্যে দুজন সাবেক সেনাসদস্য রয়েছেন: একজন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট ফিরোজ ইফতেখার এবং অপরজন অবসরপ্রাপ্ত কর্পোরাল মুকুল। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, আটক ফিরোজ ইফতেখার ‘জাস্টিস ফর কমরেডস’ নামের একটি সংগঠনের সদস্য, আর কর্পোরাল মুকুল ‘সহযোদ্ধা’ নামের একটি গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত, যা সেনাবাহিনী থেকে বিতাড়িত বা অসন্তুষ্টদের নিয়ে গঠিত।

এর আগে গত ১৪ জুন উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরে র‍্যাবের পোশাকে নগদ ডিস্ট্রিবিউটরের দুই কর্মীর কাছ থেকে এক কোটি ৮ লাখ টাকা ভর্তি ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এই ঘটনায় জড়িত ৫ জনকে পরে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ২২ লাখ টাকা উদ্ধার হয়। এই ডাকাতিতে চাকরিচ্যুত পুলিশ ও সেনাসদস্যরা জড়িত ছিলেন।

এছাড়াও, গত ২৬ মার্চ ভোরে যৌথ বাহিনী সেজে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে ৩৬ লাখ টাকা এবং স্বর্ণালংকার লুট করা হয়, যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক ও বর্তমান ১১ সদস্য জড়িত ছিলেন। গত ১১ জানুয়ারি গুলশানের একটি বাসা থেকে যৌথ বাহিনীর পরিচয়ে ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৩৪ লাখ টাকা লুট করা হয়েছিল। একই মাসে গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলের উল্টো পাশে এক মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীর এক কোটি টাকা লুট হয়। এই দুটি ডাকাতির ঘটনায়ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৬ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।

গত বছরের ১২ অক্টোবর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনী সেজে একটি বাসা থেকে ৭০ ভরি স্বর্ণালংকার ও ৭৫ লাখ টাকা লুট করা হয়। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ১১ সদস্য ও তাদের সোর্সের নাম আসে, যাদের মধ্যে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের বক্তব্য

সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, এই শ্রেণির অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করা আরও চ্যালেঞ্জের। এমন ঘটনা হঠাৎ করে ঘটেনি, বহু আগে থেকেই ঘটছে। তবে গত ১০ মাসে এমন অপরাধের সংখ্যা বেশি। তিনি এই অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, “আমরা অপরাধীকে অপরাধী হিসাবেই গণ্য করি। অপরাধী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।” তিনি আরও জানান, বাহিনীর কোনো সদস্য অপরাধে জড়াচ্ছে কিনা, তাও নজরদারি করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কেউ অভিযানে গেলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে কাছের থানায় জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।