তেহরানে ইসরায়েলি হামলা: প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মুমতাহিনা
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ জুন ২০২৫
- / 383
ইরানে ইসরায়েলি হামলার সময় তেহরানের আল-জাহরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মুমতাহিনা খাতুন। রেড অ্যালার্ট জারির পর রাজধানী ছেড়ে তিনি এখন ইরানের তুরস্ক সীমান্তবর্তী একটি শহরে আশ্রয় নিয়েছেন। গত চারদিন প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুভয় নিয়ে কেটেছে তার, সেই রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার কথা শুনলেন সজীব মিয়া।
মুমতাহিনা খাতুন জানান, গত ১৩ জুন ভোরে এক বিকট শব্দে তার ঘুম ভাঙে। রাত সাড়ে তিনটায় ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পরই কানফাটানো আওয়াজ। বারান্দায় গিয়ে দেখেন আকাশ পরিষ্কার, কোনো মেঘ নেই। এর মধ্যেই হোস্টেলের ভেতরে হইচই আর চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। তিনি নিচে নেমে এসে দেখেন অনেকেই মাঠে বেরিয়ে এসেছেন। তৃতীয়বারের মতো আরও একটি শব্দ শুনে পরিষ্কার বোঝা যায়, সেটি ছিল বিস্ফোরণের শব্দ। দূরে একটি আবাসিক এলাকায় আগুন জ্বলতে দেখা যায়, যা তেহরানের গুলশানের মতো একটি ভিআইপি এলাকা। সামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ শীর্ষ পেশার মানুষের বসবাস সেখানে। দিনের আলো ফোটার পর সেখান থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
রাজশাহীর মায়ের উদ্বেগ ও তেহরানের ভয়াল চিত্র
হোস্টেলের লোকজন তাকে জানান যে ইসরায়েল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও পরে ইসরায়েলি হামলার কথা জানানো হয়। সেই ভোরে আর কেউ ঘুমাতে পারেননি।
ইরানে ইসরায়েলি হামলার খবর মুমতাহিনার রাজশাহীর বাড়িতেও পৌঁছে যায়। তার মা উদ্বেগের সঙ্গে ফোন দেন। মুমতাহিনা তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে, তাদের বিশ্ববিদ্যালয় তেহরানের তিন নম্বর অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে রাষ্ট্রীয় টিভি স্টেশন, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। হোস্টেলের পাশেই কোরীয় দূতাবাস, তাই সেখানে হামলার আশঙ্কা কম।
সেদিন ভোরে হামলার পর সারাদিন আর কোনো বিস্ফোরণের শব্দ না পেলেও, তেহরানের বাইরে বিভিন্ন জায়গায় ইসরায়েলি আক্রমণের খবর আসছিল। ইরানও যে ইসরায়েলে পাল্টা আক্রমণ করেছে, সে খবরও তিনি জানতে পারেন। কিন্তু রাতে আবার বিস্ফোরণের শব্দ তার কানে আসে। নির্ঘুম রাত পার করতে করতে তার মনে হতে থাকে, কবে এই এলাকা ছাড়তে পারবেন।
মৃত্যুভয় ও ক্যাম্পাসে হামলার আতঙ্ক
প্রতিমুহূর্তে মৃত্যুভয় নিয়ে দিন কাটতে থাকে মুমতাহিনার। সবসময় মনে হতো, কখন না জানি একটা গোলা এসে তাদের ওপর পড়ে। দিনের বেলা মানুষের সঙ্গে দেখাশোনা, কথাবার্তায় কেটে গেলেও রাত হলেই অস্থিরতা ভর করত। এর মধ্যেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসও আক্রান্ত হলে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। নিরাপত্তার কথা ভেবে অনেকে বেজমেন্টে আশ্রয় নেন। সেখানে মোটেও ঘুমানোর উপযোগী পরিবেশ ছিল না।
মুমতাহিনা জানান, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নির্বিকার ছিল, কোনো দিকনির্দেশনা পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে তিনি নিজে থেকেই যার যার দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছিলেন।
১৫ জুন ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিংয়ের (আইআরআইবি) ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এটি তাদের ক্যাম্পাসের কাছেই অবস্থিত। কাছাকাছি আরও সামরিক ও পারমাণবিক গবেষণাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। যখন-তখন বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে শুনতে তার কান যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
তেহরান ছেড়ে তুরষ্ক সীমান্তে আশ্রয়
ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বাসিন্দাদের তেহরান ছাড়তে বলা হয়। অজানা শঙ্কা নিয়ে মুমতাহিনা কোথায় যাবেন, তা নিয়ে ভাবতে থাকেন। তার এক বান্ধবীর বাড়ি ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি। তার আমন্ত্রণে, তেহরান থেকে দূরের সেই শহরটি নিরাপদ ভেবে আপাতত সেখানেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুমতাহিনা।
তবে তার আগেই ১৬ জুন রাতে ক্যাম্পাসে হামলার আশঙ্কায় হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে এক কর্মকর্তার বাসায় আশ্রয় নিতে হয় তাকে। রাতটা কোনোমতে পার করে সকালে ক্যাম্পাসে ফিরে ব্যাগ নিয়ে তিনি ছুটলেন বাসস্ট্যান্ডের দিকে।
অন্য এক তেহরান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
পথে যেতে যেতে মুমতাহিনা এক অন্যরকম তেহরানকে দেখেন। জনবহুল ঢাকা যেমন ঈদের ছুটিতে সুনসান হয়ে যায়, অনেকটা তেমন। দু-একটা গাড়ি চলছিল, কিন্তু পথচলতি মানুষের দেখা ছিল না। অথচ এ সময় স্কুলের পথ ধরে শিশু, কর্মচারীরা ছোটেন অফিসে।
বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে কর্মচঞ্চল শহরের কিছুটা আঁচ পাওয়া যায়। ভীতসন্ত্রস্ত মানুষেরা সেখানে এসে ভিড় করেছে। সবাই শহর ছাড়তে মরিয়া। বিভিন্ন গন্তব্যমুখী বাসগুলোয় যাত্রীরা গাদাগাদি করে উঠেছে। মুমতাহিনারা দুটি সিট পেলেও, হুড়মুড় করে আরও মানুষ ওঠায় অনেকে সিট না পেয়ে মাঝের জায়গাতেই ব্যাগ রেখে কোনোমতে বসে পড়ে। এই দৃশ্য ইরানে কল্পনাও করা যায় না। সবার চোখেমুখে বাঁচার আকুতি ছিল স্পষ্ট।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফারসি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর করে ২০২২ সালে তেহরানে এসেছিলেন মুমতাহিনা। ইতিহাসে সমৃদ্ধ এই শহরের প্রতিটি কোণ যেন দেখার মতো। তেহরানের প্রতি তার এক অদ্ভুত মায়া কাজ করে।
সেই প্রিয় শহর ছেড়ে আসার সময় তিনি দেখেন, অনেক জায়গা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, কোথাও কোথাও এখনো ধোঁয়া উড়ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। বাসে একবার তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখিও হতে হয়; তারা মুঠোফোন ঘেঁটে দেখেছিলেন।
এভাবেই প্রায় এক হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে রাত এগারোটায় মুমতাহিনা তুরস্ক সীমান্তবর্তী পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের একটি শহরে পৌঁছান এবং বান্ধবীর বাসায় আশ্রয় নেন।
তিনি জানেন না কবে দেশে ফিরতে পারবেন। তিনি ভাবছেন, যদি বাংলাদেশ হাইকমিশন তুরস্ক বা অন্য কোনো দেশে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে নিজেই সেখান থেকে দেশে ফেরার চেষ্টা করবেন। যুদ্ধের কারণে এক মাসের জন্য তাদের ক্যাম্পাস বন্ধ হয়েছে। তিনি ভাবছেন, আদৌ আবার ফিরতে পারবেন তো? শহরটা ছেড়ে আসতে আসতে তার মনে হচ্ছিল, এই শহর কি এমনই থাকবে? নাকি বোমার আঘাতে একদিন পুরোপুরি বদলে যাবে?
এত সব ভাবনার মধ্যেই মনে মনে বলেছেন, “বিদায়, তেহরান।”

























