[১ম কিস্তি]
ডা. জাহেদের হাতে গড়া ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতির ইতিহাস
- আপডেট সময় : ১২:২৫:০৯ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২০ জুলাই ২০২৫
- / 575
উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিস রোগ একটি নীরব ঘাতক হয়ে উঠেছে। এর মোকাবেলায় যে সমন্বিত প্রচেষ্টার দরকার, সেকথা বহুবছর আগেই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম।
১৯৫৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন Diabetic Association of Pakistan, যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর Diabetic Association of Bangladesh নামে পরিচিতি লাভ করে। এই সংগঠন কেবল একটি চিকিৎসা কেন্দ্র নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলন হিসেবে কাজ করেছে। এর উদ্দেশ্য ছিল ডায়াবেটিস সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, রোগ নিয়ন্ত্রণে নীতিমালা তৈরি করা, এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুলভ চিকিৎসা নিশ্চিত করা। স্বেচ্ছাসেবক, রোগী ও তাদের পরিবার, চিকিৎসক, খাদ্য বিশেষজ্ঞ এবং সমাজকর্মীদের সমন্বয়ে এই অ্যাসোসিয়েশন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলে। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ডায়াবেটিক সমিতির হাসপাতাল।
এরপর ১৯৮০ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিসঅর্ডারস (সংক্ষেপে বারডেম – BIRDEM)। জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বিআইআরডিইএমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ‘বাংলাদেশ মডেল’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ (WHO) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই উদ্যোগকে প্রশংসা করেছে।
এদিকে, মহৎপ্রাণ ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম যেন পরশপাথর হয়ে তার কর্মের দীপ্তি ছড়িয়ে দেন সারা দেশময়। তারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার সুযোগ্য ছাত্র, ফরিদপুরের আরেক মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ডা. মোহাম্মদ জাহেদ, কতিপয় সমাজসেবকদের সাথে নিয়ে ১৯৮৩ সালের ২৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করেন ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি।
ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের আরেক সুযোগ্য ছাত্র ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী হন সভাপতি এবং ডা. মোহাম্মদ জাহেদ সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সৈয়দ সোলায়মান ঝিলটুলীতে একটি পুরাতন দ্বিতল ভবনের দোতলা এই সমিতিকে বন্দোবস্ত দেন। সে বছর থেকে এখানে ডায়াবেটিক রোগ পরীক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ওই বছরের ২৫ নভেম্বর ঢাকাস্থ বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অ্যাফিলিয়েশন প্রাপ্ত হয়। ১৯৮৬ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী মেজর জেনারেল মহব্বতজান চৌধুরী এর উদ্বোধন করেছিলেন।
সেদিন বিন্দু থেকে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি আজ ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটে বিস্তার লাভ করেছে।
ডা. মোহাম্মদ জাহেদ ১৯২৮ সালের ১ মার্চ ফরিদপুরের বিল মামুদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ১৯৪৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তখন ক্যাম্পাসে বাংলা নাটক নিষিদ্ধ ছিল। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করে সেখানে নাটক মঞ্চায়ন শুরু করেন। এভাবেই ভাষা আন্দোলনে তার অংশগ্রহণ ঘটে। তিনি ১৯৫২-৫৩ সালে ঢামেকের ছাত্রছাত্রী সংসদের ভিপি হয়েছিলেন।
১৯৫৮ সালে এমবিবিএস পাশ করে তিনি চুয়াডাঙ্গা মহকুমা মেডিক্যাল অফিসার পদে যোগ দেন। দু’বছর পরে চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে ফরিদপুরে ফিরে আসেন। চেম্বার নিয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শুরু করেন। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সেবায় বিনামূল্যে প্রাপ্ত স্যাম্পলগুলো তাদের দিতেন।
১৯৮০ সালে হাসান নামে চার বছরের একটি শিশু কৃমির ওষুধের অভাবে অন্ধ হয়ে যায়। এ ঘটনা তাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। এরপর তিনি অধ্যাপক শেখ আব্দুস সামাদ, অধ্যাপক এমএ সামাদ, ডা. ননী গোপাল সাহা, ডা. আব্দুর রাজ্জাক, ডা. আব্দুস সালাম চৌধুরী, রকিবউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক রবীন্দ্রনাথ সাহা, কামরুজ্জামান খান জাসু প্রমুখ ব্যক্তিদের নিয়ে ওই বছরের ২ মার্চ রেডক্রস সানডে ফ্রি ক্লিনিক নামে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৮০ সালের ২১ অক্টোবর তিনি বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধকল্যাণ সমিতি ফরিদপুর জেলা শাখা প্রতিষ্ঠা করেন।
সানডে ফ্রি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর শিশু চিকিৎসা কেন্দ্রের নিজস্ব শিশু ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সামরিক শাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এর উদ্বোধন করেন। এটিই বর্তমানে ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল। ১৯৯২ সালের ২ সেপ্টেম্বর এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান ঘটে।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সরকার তার সমাজকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বাংলাদেশ জাতীয় সমাজ কল্যাণ পরিষদ পুরস্কার-১৯৮৮ প্রদান করে। এরপর ১৯৯৬ সালে জসীম ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক (মরণোত্তর) লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে বিএমএ ফরিদপুর শাখা তাকে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করে।
ফরিদপুরে সমাজসেবায় তার বিশাল অবদান রয়েছে। তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চিকিৎসা পেশায় ও সমাজসেবায় নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। ফরিদপুরে স্বাস্থ্য ও সমাজ সেবায় বিশেষ ভূমিকা পালন করায় ফরিদপুরবাসী তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।
[তথ্য সূত্র: ২ সেপ্টেম্বর ২০০১ সালে অধ্যাপক এম এ সামাদের সম্পাদনায় প্রকাশিত ডাঃ মোহাম্মদ জাহেদ স্মারক গ্রন্থ]


























