ঢাকা ০৮:৪৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আসন্ন বাজেটে বড় ধামাকা: বিনা শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:৪৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬
  • / 110

দেশের বর্তমান বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বেগবান করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নানামুখী সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। বিশেষ করে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার ধারা বন্ধ করতে এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী বাজেটে বিনা শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে সরকার। আগামী ১১ জুন নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেট ঘোষিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য এক বড় ‘লিটমাস টেস্ট’।

কেন এই বিশেষ সুযোগের সুপারিশ?

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপর্যস্ত অবস্থা, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও এক লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরা দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনা শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।

১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর ও পূর্ণ দায়মুক্তির প্রস্তাব:

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন যেকোনো খাতে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলে অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না—এমন একটি ‘পূর্ণ দায়মুক্তি’ বা ইনডেমনিটি বিধান ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা চলছে। এ ক্ষেত্রে ঘোষিত টাকার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিরোধিতার কারণে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

বিদ্যমান আয়কর আইনে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর ও তার ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার স্থায়ী সুযোগ থাকলেও, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা এনবিআরের ভবিষ্যৎ হয়রানির ভয়ে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখান না। তাই এবার পূর্ণ সুরক্ষার মাধ্যমে আবাসন খাত, শেয়ারবাজার এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে এই অর্থ টানার সুপারিশ করা হয়েছে।

কী বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা?

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল জানান, আগামী বাজেটে বিনা প্রশ্নে এই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে আবাসন ও এর সাথে জড়িত ২২০ থেকে ২৫০টি সাব-সেক্টরে ব্যাপক বিনিয়োগ আসবে। এতে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর বেকারত্ব দূর হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। একইভাবে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অর্থনীতি সচল করতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে সরকার যে সুবিধাই দিক না কেন, তা যেন দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য হয়।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বর্তমান সংকট বিবেচনায় নীতিগত কঠোরতা কিছুটা শিথিল করার পক্ষে মত দিলেও, বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত সহজ সুযোগ দেওয়া হলে নিয়মিত সৎ করদাতারা কর পরিশোধে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা ফিরছে:

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ঔষধ, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষি খাত, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনমুখী শিল্পসহ ২০টিরও বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশের আদলে কর ছাড়ের সুবিধা পুনর্বহালের চিন্তাভাবনা করছে নতুন সরকার, যা বিগত বাজেটে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিশেষ সুবিধার আওতায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কালো টাকা সাদা হয়েছিল, যা থেকে সরকার ২০৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। দেশের বর্তমান সংকটকালীন ক্রান্তিলগ্নে আসন্ন বাজেট আবারও সেই অর্থনৈতিক মূল স্রোতে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে পারে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

আসন্ন বাজেটে বড় ধামাকা: বিনা শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ

আপডেট সময় : ১২:৪৬:৪৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬

দেশের বর্তমান বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বেগবান করতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে নানামুখী সাহসী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে নতুন সরকার। বিশেষ করে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার ধারা বন্ধ করতে এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে আগামী বাজেটে বিনা শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছে সরকার। আগামী ১১ জুন নতুন সরকারের এই প্রথম বাজেট ঘোষিত হওয়ার কথা রয়েছে, যা বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য এক বড় ‘লিটমাস টেস্ট’।

কেন এই বিশেষ সুযোগের সুপারিশ?

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া বিপর্যস্ত অবস্থা, করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা, স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন শাসন এবং বর্তমান সময়ে বৈশ্বিক ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপের মুখে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও এক লাখ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব ঘাটতির কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও নতুন বিনিয়োগ থমকে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকেরা দেশে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিনা শর্তে অপ্রদর্শিত অর্থ মূলধারার অর্থনীতিতে আনার পরামর্শ দিয়েছেন।

১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর ও পূর্ণ দায়মুক্তির প্রস্তাব:

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এমন যেকোনো খাতে বিনিয়োগের ঘোষণা দিলে অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করা হবে না—এমন একটি ‘পূর্ণ দায়মুক্তি’ বা ইনডেমনিটি বিধান ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা চলছে। এ ক্ষেত্রে ঘোষিত টাকার বিপরীতে মাত্র ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কর দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিরোধিতার কারণে বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

বিদ্যমান আয়কর আইনে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ কর ও তার ওপর ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার স্থায়ী সুযোগ থাকলেও, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা এনবিআরের ভবিষ্যৎ হয়রানির ভয়ে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখান না। তাই এবার পূর্ণ সুরক্ষার মাধ্যমে আবাসন খাত, শেয়ারবাজার এবং উৎপাদনমুখী শিল্পে এই অর্থ টানার সুপারিশ করা হয়েছে।

কী বলছেন খাত সংশ্লিষ্টরা?

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল জানান, আগামী বাজেটে বিনা প্রশ্নে এই অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হলে আবাসন ও এর সাথে জড়িত ২২০ থেকে ২৫০টি সাব-সেক্টরে ব্যাপক বিনিয়োগ আসবে। এতে প্রায় ৫০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর বেকারত্ব দূর হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। একইভাবে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, অর্থনীতি সচল করতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। তবে সরকার যে সুবিধাই দিক না কেন, তা যেন দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য হয়।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন বর্তমান সংকট বিবেচনায় নীতিগত কঠোরতা কিছুটা শিথিল করার পক্ষে মত দিলেও, বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান সতর্ক করে বলেন, অতিরিক্ত সহজ সুযোগ দেওয়া হলে নিয়মিত সৎ করদাতারা কর পরিশোধে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ সুবিধা ফিরছে:

অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে ঔষধ, অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই), কৃষি খাত, কৃষি যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদনমুখী শিল্পসহ ২০টিরও বেশি খাতে নতুন বিনিয়োগের জন্য ‘ট্যাক্স হলিডে’ বা কর অবকাশের আদলে কর ছাড়ের সুবিধা পুনর্বহালের চিন্তাভাবনা করছে নতুন সরকার, যা বিগত বাজেটে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিশেষ সুবিধার আওতায় সর্বোচ্চ ২০ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা কালো টাকা সাদা হয়েছিল, যা থেকে সরকার ২০৬৪ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। দেশের বর্তমান সংকটকালীন ক্রান্তিলগ্নে আসন্ন বাজেট আবারও সেই অর্থনৈতিক মূল স্রোতে অর্থ প্রবাহ বাড়াতে পারে কি না, তা-ই এখন দেখার বিষয়।