ঢাকা ০৯:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে জামায়াত কাঁটা: ফরিদপুরের রাজনীতিতে আগুন

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১০:৩৪:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
  • / 174

ক্ষমতার অলিন্দে পালাবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু ফরিদপুর বিএনপির অন্দরে জমে থাকা দীর্ঘ চার দশকের পুরোনো ক্ষোভ আর সমান্তরাল দুই ধারার লড়াইয়ে যে এতটুকু মরচে পড়েনি, তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’র এক মঞ্চকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেত্রী—শামা ওবায়েদ এবং চৌধুরী নায়াব ইউসুফের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভেদ আবারও প্রকাশ্য রাজপথে এসে আছড়ে পড়েছে। গত শনিবার বিকেলে শহরের বাজার এলাকার থানা রোডে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব এখন রূপ নিয়েছে এক তীব্র রাজনৈতিক বাগযুদ্ধে।

এক পক্ষের সংবর্ধনা বর্জন, অন্য পক্ষের ক্ষমতার আস্ফালন আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামায়াত বিতর্ক—সব মিলিয়ে ফরিদপুরের রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে।

সংবর্ধনার মোড়কে ক্ষমতার লড়াই ও নায়াব ইউসুফের বর্জন

অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে নাটকের সূত্রপাত এর আমন্ত্রণপত্র থেকেই। আয়োজকদের পাঠানো প্রাথমিক চিঠিতে এটিকে ‘মিজ শামা ওবায়েদ ইসলামের নাগরিক সংবর্ধনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, শেষ মুহূর্তে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে অনুষ্ঠানের মূল ব্যানারে লেখা হয় ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ। অন্যদিকে, ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফকে বিশেষ অতিথি করা হলেও, তিনি স্পষ্টভাবেই এই আয়োজন বর্জন করেন।

এর আগে গত ৭ মে ফরিদপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই নেত্রীর সমর্থকেরা প্রকাশ্য বিরোধে লিপ্ত হওয়ার পর শামা ওবায়েদ শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো বড় সভায় আসেননি। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর অনুসারীরাই ‘নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে মূলত এই সভার আয়োজন করে নিজেদের শক্তির জানান দিতে চেয়েছিলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এ তো বাবার আমলের বিরোধ!

জেলা বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মতে, শামা ও নায়াবের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াই একেবারেই নতুন কিছু নয়; বরং এটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। ১৯৭৯ সালে ফরিদপুরে বিএনপির সূচনালগ্ন থেকেই শামা ওবায়েদের মরহুম বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান এবং নায়াব ইউসুফের মরহুম বাবা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ দলের দুটি পৃথক অংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। বাবারা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সেই দুই সমান্তরাল শিবিরের রাশ এখন তাঁদের কন্যারা ধরে রেখেছেন সমান তালে।

‘জামায়াত সূচ হয়ে ঢোকে, ফাল হয়ে বের হয়’: নায়াবের বিস্ফোরক তোপ

শনিবারের ওই অনুষ্ঠানে ফরিদপুর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা এবং গত নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে পরাজিত জামায়াত প্রার্থী আবদুত তাওয়াব অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলো করে বসেন। জামায়াত নেতাদের এই উপস্থিতি এবং শামা ওবায়েদের শিবিরের এমন রাজনৈতিক সমঝোতাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

চৌধুরী নায়াব ইউসুফের স্পষ্ট বক্তব্য: “জামায়াতকে কোলে নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির আদর্শ নয়। জামায়াত সূচ হয়ে ঢোকে, আর ফাল হয়ে বের হয়। এরা সব সময় বিএনপির রাজনীতির ক্ষতি করে এসেছে। গত জাতীয় নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে পরাজিত জামায়াত প্রার্থী যে বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন, তা ছিল কল্পনার অতীত। এখন ধীরে ধীরে সেই ভোট পাওয়ার পেছনের সমীকরণ ও রহস্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।”

আমন্ত্রণপত্র দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। আয়োজকদের পক্ষে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন জুয়েল দাবি করেছেন, তিনি নায়াব ইউসুফের বাড়িতে কার্ড দিয়ে এসে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। অন্যদিকে নায়াব ইউসুফের দাবি, জুয়েল যখন কার্ড দিয়ে যান তিনি বাড়ি ছিলেন না, আর পরে ফোনেও কোনো কথা হয়নি।

রাজপথ ছেড়ে এবার ফেসবুকে অনুসারীদের রক্তক্ষয়ী বাগযুদ্ধ

এই সংঘাত শুধু সভামঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিষ ছড়াচ্ছে ভার্চুয়াল জগতেও। নাগরিক কমিটির এই সভার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই নেত্রীর অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট দিতে শুরু করেছেন। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে শামা ওবায়েদের অনুসারীদের সরাসরি ইঙ্গিত করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এই পুরোনো ক্ষমতার অলিখিত যুদ্ধ আগামী দিনে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক ভিতকে কতটা আলগা করে দেবে, নাকি এই দ্বন্দ্বের ফায়দা তুলে নিয়ে অন্য কোনো শক্তি মাঠ দখল করবে, সেই উত্তর এখন সময়ের গর্ভে।

উত্তরাধিকারের লড়াইয়ে জামায়াত কাঁটা: ফরিদপুরের রাজনীতিতে আগুন

আপডেট সময় : ১০:৩৪:৫৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

ক্ষমতার অলিন্দে পালাবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু ফরিদপুর বিএনপির অন্দরে জমে থাকা দীর্ঘ চার দশকের পুরোনো ক্ষোভ আর সমান্তরাল দুই ধারার লড়াইয়ে যে এতটুকু মরচে পড়েনি, তা আরও একবার প্রমাণ হয়ে গেল। ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’র এক মঞ্চকে কেন্দ্র করে জেলা বিএনপির দুই শীর্ষ নেত্রী—শামা ওবায়েদ এবং চৌধুরী নায়াব ইউসুফের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বিভেদ আবারও প্রকাশ্য রাজপথে এসে আছড়ে পড়েছে। গত শনিবার বিকেলে শহরের বাজার এলাকার থানা রোডে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে দুই পক্ষের দ্বন্দ্ব এখন রূপ নিয়েছে এক তীব্র রাজনৈতিক বাগযুদ্ধে।

এক পক্ষের সংবর্ধনা বর্জন, অন্য পক্ষের ক্ষমতার আস্ফালন আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামায়াত বিতর্ক—সব মিলিয়ে ফরিদপুরের রাজনীতির পারদ এখন তুঙ্গে।

সংবর্ধনার মোড়কে ক্ষমতার লড়াই ও নায়াব ইউসুফের বর্জন

অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে নাটকের সূত্রপাত এর আমন্ত্রণপত্র থেকেই। আয়োজকদের পাঠানো প্রাথমিক চিঠিতে এটিকে ‘মিজ শামা ওবায়েদ ইসলামের নাগরিক সংবর্ধনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, শেষ মুহূর্তে ড্যামেজ কন্ট্রোলে নেমে অনুষ্ঠানের মূল ব্যানারে লেখা হয় ‘নাগরিক আলোচনা ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি’। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ। অন্যদিকে, ফরিদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফকে বিশেষ অতিথি করা হলেও, তিনি স্পষ্টভাবেই এই আয়োজন বর্জন করেন।

এর আগে গত ৭ মে ফরিদপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুই নেত্রীর সমর্থকেরা প্রকাশ্য বিরোধে লিপ্ত হওয়ার পর শামা ওবায়েদ শহরের প্রাণকেন্দ্রে কোনো বড় সভায় আসেননি। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর অনুসারীরাই ‘নাগরিক কমিটি’র ব্যানারে মূলত এই সভার আয়োজন করে নিজেদের শক্তির জানান দিতে চেয়েছিলেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

এ তো বাবার আমলের বিরোধ!

জেলা বিএনপির প্রবীণ নেতাদের মতে, শামা ও নায়াবের এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক লড়াই একেবারেই নতুন কিছু নয়; বরং এটি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত। ১৯৭৯ সালে ফরিদপুরে বিএনপির সূচনালগ্ন থেকেই শামা ওবায়েদের মরহুম বাবা কে এম ওবায়দুর রহমান এবং নায়াব ইউসুফের মরহুম বাবা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ দলের দুটি পৃথক অংশের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন। বাবারা চলে গেছেন, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া সেই দুই সমান্তরাল শিবিরের রাশ এখন তাঁদের কন্যারা ধরে রেখেছেন সমান তালে।

‘জামায়াত সূচ হয়ে ঢোকে, ফাল হয়ে বের হয়’: নায়াবের বিস্ফোরক তোপ

শনিবারের ওই অনুষ্ঠানে ফরিদপুর-১ আসনের জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য মো. ইলিয়াস মোল্লা এবং গত নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে পরাজিত জামায়াত প্রার্থী আবদুত তাওয়াব অতিথি হিসেবে মঞ্চ আলো করে বসেন। জামায়াত নেতাদের এই উপস্থিতি এবং শামা ওবায়েদের শিবিরের এমন রাজনৈতিক সমঝোতাকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন সংসদ সদস্য চৌধুরী নায়াব ইউসুফ।

চৌধুরী নায়াব ইউসুফের স্পষ্ট বক্তব্য: “জামায়াতকে কোলে নিয়ে রাজনীতি করা বিএনপির আদর্শ নয়। জামায়াত সূচ হয়ে ঢোকে, আর ফাল হয়ে বের হয়। এরা সব সময় বিএনপির রাজনীতির ক্ষতি করে এসেছে। গত জাতীয় নির্বাচনে ফরিদপুর-৩ আসনে পরাজিত জামায়াত প্রার্থী যে বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়েছিলেন, তা ছিল কল্পনার অতীত। এখন ধীরে ধীরে সেই ভোট পাওয়ার পেছনের সমীকরণ ও রহস্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে।”

আমন্ত্রণপত্র দেওয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চলছে কাদা ছোড়াছুড়ি। আয়োজকদের পক্ষে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জুলফিকার হোসেন জুয়েল দাবি করেছেন, তিনি নায়াব ইউসুফের বাড়িতে কার্ড দিয়ে এসে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। অন্যদিকে নায়াব ইউসুফের দাবি, জুয়েল যখন কার্ড দিয়ে যান তিনি বাড়ি ছিলেন না, আর পরে ফোনেও কোনো কথা হয়নি।

রাজপথ ছেড়ে এবার ফেসবুকে অনুসারীদের রক্তক্ষয়ী বাগযুদ্ধ

এই সংঘাত শুধু সভামঞ্চেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা বিষ ছড়াচ্ছে ভার্চুয়াল জগতেও। নাগরিক কমিটির এই সভার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই নেত্রীর অনুসারীরা একে অপরের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক পোস্ট দিতে শুরু করেছেন। জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে শামা ওবায়েদের অনুসারীদের সরাসরি ইঙ্গিত করে তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন।

বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা এই পুরোনো ক্ষমতার অলিখিত যুদ্ধ আগামী দিনে ফরিদপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক ভিতকে কতটা আলগা করে দেবে, নাকি এই দ্বন্দ্বের ফায়দা তুলে নিয়ে অন্য কোনো শক্তি মাঠ দখল করবে, সেই উত্তর এখন সময়ের গর্ভে।