কাকে দিয়ে খুন করিয়েছেন জানি: মমতার এক মন্তব্যে তোলপাড় বাংলাদেশ
- আপডেট সময় : ১২:৪২:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
- / 89
রাজনীতিতে শব্দই শেষ কথা, আবার সেই শব্দই কখনো কখনো হয়ে ওঠে আগ্নেয়গিরি। কলকাতার ধর্মতলার এক মঞ্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গ নেত্রী মমতা ব্যানার্জীর ছুড়ে দেওয়া মাত্র কয়েকটি বাক্য এখন সীমান্ত পেরিয়ে আছড়ে পড়েছে ঢাকার রাজনৈতিক অলিন্দে। ‘বাংলাদেশে কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন জানি’—সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর এই বিস্ফোরক দাবির পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র কৌতূহল ও জল্পনা। ক্ষমতাসীন বিএনপি সতর্ক অবস্থান নিলেও, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্পষ্ট মনে করছে, মমতার এই তিরের নিশানা আসলে ঢাকার আলোচিত ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকেই। খবর বিবিসির।
যেহেতু মমতার এই বয়ানে খোদ ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নাম জড়িয়েছে, তাই দিল্লির কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলগুলোর একাংশ।
মমতার সেই ‘তথ্য ভাণ্ডার’ ও অমিত শাহের ফোন:
ঠিক কী ঘটেছিল গত মঙ্গলবার (২ জুন)? কলকাতার ধর্মতলায় এক ধরনা মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (STF) ভূয়সী প্রশংসা করতে গিয়ে এক গোপন অধ্যায়ের সিলমোহর ভাঙেন। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশ থেকে এক বড় খুনি মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে পড়লে এএসটিএফ তাকে গ্রেপ্তার করে।
মমতার কথায়, “তার পরে হোম মিনিস্টার (অমিত শাহ) নিজে আমাকে ফোন করে বলেন… আপনি বেঙ্গল পুলিশকে বলে দিন এই কথা যেন বাইরে না যায়। এটা দেশের স্বার্থে।” এখানেই থামেননি তৃণমূল নেত্রী, সুর চড়িয়ে প্রশ্ন ছুড়েছেন, “কাকে দিয়ে খুন করিয়েছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হলেও আমি তো সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা তথ্য ভাণ্ডার, সত্য ভাণ্ডার।”
ইশারা কি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকে?
মমতা ব্যানার্জী সরাসরি কোনো নাম না নিলেও, সমস্ত সমীকরণ গিয়ে মিলছে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়া ‘ইনকিলাব মঞ্চের’ আলোচিত সংগঠক শরিফ ওসমান হাদির ওপর। কাকতালীয়ভাবে, চলতি বছরের মার্চ মাসেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ এই হাদি হত্যাকাণ্ডের দুই মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে মালদা ও নদীয়া সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করেছিল, যারা মেঘালয় হয়ে ভারতে ঢুকেছিল। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশও ফয়সালকে হাদি হত্যার মূল হোতা বলেছিল।
ঢাকার রাজনীতিতে তোলপাড় ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া:
মমতার এই মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আসামাত্রই তোলপাড় শুরু হলেও মূলধারার দলগুলো বেশ মেপে পা ফেলছে। সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “পাশের দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে। সেখানে তিনি পরাজিত হয়ে তাদের সরকারকে উদ্দেশ্য করে কিছু কথা বলেছেন। সেটি আমাদের আলোচনার বিষয় নয়।” তবে হাদি হত্যার বিচার প্রসঙ্গে তিনি জানান, অপরাধীদের ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতের সাথে কূটনৈতিক স্তরে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
অন্যদিকে, বিএনপির নেতারা বিষয়টি নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে বিরক্তি প্রকাশ করলেও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একে ‘আধিপত্যবাদী খেলার’ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “মমতা ব্যানার্জীর কথা থেকে বোঝা যায় যে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভারত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত এবং এদেশের সরকারে ওঠা-নামার রাজনীতিতে ভারত যে খেলা খেলে, সেই খেলাতেই তারা মেতে উঠেছে।”
এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন আরও এক কদম এগিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, “কড়া সীমান্ত পাহারা সত্ত্বেও খুনিরা কীভাবে মেঘালয় দিয়ে ভারতে আশ্রয় পেল? মমতার বক্তব্যেই তার সূত্র লুকিয়ে আছে। সরকারের উচিত এখনই ভারতের কাছে এর কৈফিয়ত চাওয়া।”
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, নির্বাচনে হারার পর ওপার বাংলায় পরস্পরকে দোষারোপের সংস্কৃতি নতুন নয়। তবে যেহেতু ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাম এসেছে, তাই তথ্যের ভিত্তি খতিয়ে দেখে বাংলাদেশ সরকার একটি কূটনৈতিক ব্যাখ্যা চাইতেই পারে।
























