ভোটের মাঠে ‘বন্দুক চালানোর ক্ষমতা’ চায় সেনাবাহিনী: ইসি দিতে নারাজ
- আপডেট সময় : ১২:০৫:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৫
- / 262
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক লাখেরও বেশি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ভোটের দায়িত্ব পালন করবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্প্রতি নির্বাচনি আইনে (আরপিও) সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার বা বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার দাবি তুলেছে সশস্ত্র বাহিনী।
নির্বাচন কমিশনের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে এই দাবিটি জানানো হয়। তবে ইসি জানিয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করার কারণে তাদেরকে আলাদা করে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার এখন আর ইসির হাতে নেই। এই বিষয়টি নিয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে।
আইনে পরিবর্তন, ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সশস্ত্র বাহিনী: আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে সংস্কার এনে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীকে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে নির্বাচনের আগে তাদের দায়িত্ব দিতে আলাদা কোনো আদেশের প্রয়োজন হবে না এবং তারা অন্যান্য বাহিনীর মতোই ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
বিচারিক ক্ষমতার দাবি: সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, নির্বাচনের সময়ও তাদের বিচারিক ক্ষমতা বা ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার বহাল রাখা হোক। উল্লেখ্য, গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর সেপ্টেম্বর থেকে সেনাবাহিনী এই বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে দায়িত্ব পালন করছে।
ইসিতে অপারগতা: নির্বাচন কমিশন বলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় যুক্ত করায় এখন সরকার ছাড়া এই ক্ষমতা দেওয়ার এখতিয়ার ইসির হাতে নেই। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানের মাছউদ জানান, আইন অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়ার ক্ষমতা এখন সরকার ছাড়া আর কেউ দিতে পারবে না।
অতীতের রেওয়াজ: ইসি জানিয়েছে, অতীতের মতোই এবারও ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর (বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা) আওতায় সশস্ত্র বাহিনীকে নির্বাচনি দায়িত্বে মোতায়েন করা হবে।
ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার কী ও কেন দাবি?
ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার বা বিচারিক ক্ষমতা হলো এমন একটি ক্ষমতা, যার ফলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাউকে গ্রেফতারের আদেশ দেওয়া, স্বল্পমেয়াদী সাজা দেওয়া বা প্রয়োজনে গুলি চালানোর মতো আদেশ দিতে পারেন।
ক্ষমতার প্রয়োগ: সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার থাকলে সেনা কর্মকর্তারা শুধু আটকই নয়, তাৎক্ষণিক বিচার করে এক মাসের জন্য জেলেও পাঠাতে পারেন।
বর্তমানে ক্ষমতা: ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭টি ধারায় ক্ষমতা পাওয়ায় এখন সেনা কর্মকর্তারা অপরাধীদের সরাসরি গ্রেফতার, কারাদণ্ড বা জামিনও দিতে পারেন।
দাবির কারণ: সশস্ত্র বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা মনে করছেন, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পুলিশ বাহিনী দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে নিতে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতামত ও বিতর্ক
নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনীকে আগাম বিচারিক ক্ষমতা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে:
পক্ষ বক্তব্য
সুবিধাভোগী পক্ষ (সাবেক সেনা কর্মকর্তা) নিরাপত্তা বিশ্লেষক এমদাদুল ইসলাম প্রশ্ন রাখেন, এক বছরের বেশি সময় ধরে বিচারিক ক্ষমতা নিয়ে মাঠে থাকা সেনাবাহিনীকে শুধু ভোটের সময় যদি সেই ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে ভোটের মাঠে তাদের রেখে লাভ কী? নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী মনে করেন, দুর্বল পুলিশ বাহিনীর কারণে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া ভালো।
বিরোধী পক্ষ (সুশীল সমাজ) টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগাম বিচারিক ক্ষমতার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি মনে করেন, নির্বাচন সুস্থ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলে আগে থেকে এই ক্ষমতা দাবি করা ঢালাও কর্তৃত্ব চাওয়ার মতো। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ইসি সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারিক ক্ষমতা না থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সেনাবাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগিতার জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হবে, যা নির্বাচনের মাঠে শঙ্কা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, অনেকে মনে করেন, ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ারের মাধ্যমে জবাবদিহিতা এড়িয়ে একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

























