ঢাকা ০৮:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মহাবিপর্যয়ের হাতছানি? ‘রেড জোন’ ঢাকায় ৯ মাত্রার ঝুঁকিতে লাখো প্রাণহানি!

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ১২:২৭:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫
  • / 918

বাংলাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে, ঘন ঘন অনুভূত হওয়া ছোট ছোট ভূকম্পনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরপর দু’দিন ভূমিকম্প হওয়া আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এতদিন দেশের বাইরে উৎপত্তি হলেও, সম্প্রতি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে ঢাকার খুব কাছে নরসিংদী ও গুলশান-বাড্ডা এলাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বর্তমানে ভূমিকম্পের ‘রেড জোনে’ রয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক ড.মেহেদি আহমেদ আনসারী সতর্ক করে বলেছেন, যে কোনো সময় ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার অর্ধেকের বেশি ভবন মাটিতে মিশে যেতে পারে, আর এতে লাখ মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা ও স্থান পরিবর্তন

গত দুই দিনের ধারাবাহিক ভূকম্পন আতঙ্ক বাড়িয়েছে।

২১ নভেম্বর: ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারা দেশ, উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার অদূরে নরসিংদীতে। এই কম্পনে ১০ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হন।

২২ নভেম্বর: ২৪ ঘণ্টা পেরোতেই সকালে নরসিংদীর পলাশ এলাকায় ৩.৩ মাত্রার মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়। সন্ধ্যায় আবার স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথমে ৩.৭ এবং পরে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর গুলশানের বাড্ডা এলাকায়।

বিপদ সংকেত: এর আগে বেশিরভাগ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বাইরে ছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল তথা রাজধানীর আশপাশে উৎপত্তি হওয়ায় এটি ঢাকার জন্য বড় বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের গুরুতর সতর্কতা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড.মেহেদি আহমেদ আনসারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন।

বিপর্যয়ের পূর্বাভাস: ড. আনসারী বলেন, “৩০ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকবার ভূমিকম্প এটা বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা।” ৬ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে ঢাকার বেশির ভাগ ভবনই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

৯ মাত্রার শঙ্কা: তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে থাকায় এখানে যে কোনো সময় ৯ মাত্রার ধ্বংসাত্মক কম্পন আঘাত হানতে পারে। এতে ১ থেকে ৩ লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে।

ভূ-চ্যুতি: অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, এখানকার ভূগর্ভে বার্মা প্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট চাপা পড়ে শক্তি জমছে, যা মুক্তির অপেক্ষায় আছে। তিনি সতর্ক করেন যে ঝুঁকির দিকটা সামনের দিকে আরও বাড়ছে, কমছে না।

বিপর্যয় মোকাবিলায় ঢাকার দুরবস্থা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসের চেয়েও বড় বিপদ আসবে গ্যাস লাইন ফেটে একসঙ্গে অগ্নিসংযোগ থেকে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি ভয়াবহভাবে অপ্রতুল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান স্বীকার করেছেন যে ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল।

ফাটল ও বিপর্যয়: মাত্র ৫.৭ মাত্রার কম্পনেই অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন জ্বলেছে। বড় ভূমিকম্প হলে গ্যাস, পানি ও পয়ঃপ্রণালির সিস্টেম ভেঙে ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে।

সরঞ্জামের অভাব: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ২০০৬ সালে যে প্রকল্প নিয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের যন্ত্রপাতি নিম্নমানের এবং কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

ভবনের ঝুঁকি ও করণীয়

ঢাকার প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে প্রায় ছয় লাখ ছয়তলার বেশি। এর দুই-তৃতীয়াংশ ভবনই নিয়ম (বিল্ডিং কোড) মানে না।

ভবন শ্রেণিকরণ: ড. আনসারী জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীর সব ভবন পরীক্ষা করে তিনটি শ্রেণিতে (সবুজ-ঝুঁকিমুক্ত, হলুদ-সংস্কার প্রয়োজন, লাল-অবিলম্বে খালি) ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

রাজউকের উদ্যোগ: রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শনে গিয়ে জানান, পুরাতন ঢাকার অধিকাংশ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মহাবিপর্যয়ের হাতছানি? ‘রেড জোন’ ঢাকায় ৯ মাত্রার ঝুঁকিতে লাখো প্রাণহানি!

আপডেট সময় : ১২:২৭:১৬ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশে, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে, ঘন ঘন অনুভূত হওয়া ছোট ছোট ভূকম্পনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরপর দু’দিন ভূমিকম্প হওয়া আরও বড় বিপর্যয়ের ইঙ্গিত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এতদিন দেশের বাইরে উৎপত্তি হলেও, সম্প্রতি ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে ঢাকার খুব কাছে নরসিংদী ও গুলশান-বাড্ডা এলাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বর্তমানে ভূমিকম্পের ‘রেড জোনে’ রয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক ড.মেহেদি আহমেদ আনসারী সতর্ক করে বলেছেন, যে কোনো সময় ৯ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকার অর্ধেকের বেশি ভবন মাটিতে মিশে যেতে পারে, আর এতে লাখ মানুষের প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে।

ভূমিকম্পের তীব্রতা ও স্থান পরিবর্তন

গত দুই দিনের ধারাবাহিক ভূকম্পন আতঙ্ক বাড়িয়েছে।

২১ নভেম্বর: ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে সারা দেশ, উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার অদূরে নরসিংদীতে। এই কম্পনে ১০ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হন।

২২ নভেম্বর: ২৪ ঘণ্টা পেরোতেই সকালে নরসিংদীর পলাশ এলাকায় ৩.৩ মাত্রার মৃদু ভূকম্পন অনুভূত হয়। সন্ধ্যায় আবার স্বল্প সময়ের ব্যবধানে প্রথমে ৩.৭ এবং পরে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর গুলশানের বাড্ডা এলাকায়।

বিপদ সংকেত: এর আগে বেশিরভাগ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল বাংলাদেশের বাইরে ছিল। কিন্তু এবারই প্রথম বাংলাদেশের মধ্যাঞ্চল তথা রাজধানীর আশপাশে উৎপত্তি হওয়ায় এটি ঢাকার জন্য বড় বিপদ সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশেষজ্ঞদের গুরুতর সতর্কতা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের প্রফেসর ড.মেহেদি আহমেদ আনসারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন।

বিপর্যয়ের পূর্বাভাস: ড. আনসারী বলেন, “৩০ ঘণ্টার মধ্যে কয়েকবার ভূমিকম্প এটা বড় ভূমিকম্পের সতর্কবার্তা।” ৬ মাত্রার বেশি ভূমিকম্প হলে ঢাকার বেশির ভাগ ভবনই ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

৯ মাত্রার শঙ্কা: তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে থাকায় এখানে যে কোনো সময় ৯ মাত্রার ধ্বংসাত্মক কম্পন আঘাত হানতে পারে। এতে ১ থেকে ৩ লাখ মানুষ হতাহত হতে পারে।

ভূ-চ্যুতি: অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার জানান, এখানকার ভূগর্ভে বার্মা প্লেটের নিচে ইন্ডিয়ান প্লেট চাপা পড়ে শক্তি জমছে, যা মুক্তির অপেক্ষায় আছে। তিনি সতর্ক করেন যে ঝুঁকির দিকটা সামনের দিকে আরও বাড়ছে, কমছে না।

বিপর্যয় মোকাবিলায় ঢাকার দুরবস্থা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পে ভবন ধসের চেয়েও বড় বিপদ আসবে গ্যাস লাইন ফেটে একসঙ্গে অগ্নিসংযোগ থেকে। দেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি ভয়াবহভাবে অপ্রতুল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান স্বীকার করেছেন যে ভূমিকম্প মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল।

ফাটল ও বিপর্যয়: মাত্র ৫.৭ মাত্রার কম্পনেই অনেক ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে আগুন জ্বলেছে। বড় ভূমিকম্প হলে গ্যাস, পানি ও পয়ঃপ্রণালির সিস্টেম ভেঙে ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয় ঘটবে।

সরঞ্জামের অভাব: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য ২০০৬ সালে যে প্রকল্প নিয়েছিল, তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। ফায়ার সার্ভিসের যন্ত্রপাতি নিম্নমানের এবং কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

ভবনের ঝুঁকি ও করণীয়

ঢাকার প্রায় ২১ লাখ ভবনের মধ্যে প্রায় ছয় লাখ ছয়তলার বেশি। এর দুই-তৃতীয়াংশ ভবনই নিয়ম (বিল্ডিং কোড) মানে না।

ভবন শ্রেণিকরণ: ড. আনসারী জরুরি ভিত্তিতে রাজধানীর সব ভবন পরীক্ষা করে তিনটি শ্রেণিতে (সবুজ-ঝুঁকিমুক্ত, হলুদ-সংস্কার প্রয়োজন, লাল-অবিলম্বে খালি) ভাগ করার পরামর্শ দিয়েছেন।

রাজউকের উদ্যোগ: রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম পুরান ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পরিদর্শনে গিয়ে জানান, পুরাতন ঢাকার অধিকাংশ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।