ঢাকা ০২:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নির্বাচনী দৌড়ে কচ্ছপ-খরগোশ উপাখ্যান: প্রতিপক্ষ কি জামায়াত নাকি ‘ভারত’?

দৈনিক জাগ্রত বাংলাদেশ ডেস্ক :
  • আপডেট সময় : ০১:২০:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 382

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে এখন ‘কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতা’-র উপাখ্যানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মগ্ন বিএনপি এখন ইশপের গল্পের ‘খরগোশ’-এর ভূমিকায়, আর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালানো জামায়াত আছে ‘কচ্ছপ’-এর অবস্থানে। তবে, পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি’র প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত নয়; বরং ভারত-কেন্দ্রিক চানক্যনীতি।

নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করবে এবং অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে পরিত্রাণ পেতে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত।

খরগোশ বিএনপি, কচ্ছপ জামায়াত: আত্মতুষ্টির বিপদ

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনে বিএনপি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। কিন্তু জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপি বটবৃক্ষ হলে জামায়াত সুপারিগাছ—এই বাস্তবতায় জামায়াত কখনোই এককভাবে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে না।

খরগোশের আত্মবিশ্বাস: বিএনপি নেতারা ধরে নিয়েছেন যে নির্বাচন হলেই তাঁরা বিজয়ী হবেন। এই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে তাঁরা দেশের পীর-মাশায়েখ, মাজার-খানকার অনুসারী, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ছোট ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি মনে করছেন না।

কচ্ছপের নিরবচ্ছিন্নতা: অন্যদিকে, জামায়াত ভারতের ‘ফুয়েল শক্তিতে’ নির্বাচনী দৌড়ে বিজয়ী হতে কচ্ছপের মতো নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিএনপি’র আসল প্রতিপক্ষ ভারত, কৌশল জামায়াত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি’র মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ‘হিন্দুত্ববাদী ভারত’। নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানকে ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দিল্লি এবং এ কাজে পর্দার আড়াল থেকে জামায়াতকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

দিল্লির অ্যাজেন্ডা: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মতো দাবিগুলো মূলত আওয়ামী লীগকে আগামী সংসদে পুনর্বাসনের দিল্লির অ্যাজেন্ডা। জামায়াত সেই অ্যাজেন্ডা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

দেওবন্দ কৌশল: ভারত এখন উত্তর প্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দের ইসলামী স্কলারদের ব্যবহার করে কওমি মাদরাসা-ভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর নেতাদের মওদূদীপন্থি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। এই কৌশলে কওমি ঘরানার দলগুলো আদর্শিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও জামায়াতের জোটসঙ্গী হচ্ছে।

রহস্যময় বক্তব্য ও জোটের নেপথ্য

পলাতক শেখ হাসিনা সম্প্রতি ইউটিউবে এক অডিও বার্তায় বলেছেন, “আগে জামায়াত ধরনা দিয়ে বিএনপির কাছ থেকে ২০টি আসন নিয়েছিল। এবার বিএনপিকে ধরনা দিয়ে জামায়াতের কাছ থেকে ২০টি আসন নিতে হবে।”

হাসিনার বক্তব্যের রহস্য: যে জামায়াতকে হাসিনা নিষিদ্ধ করেছিলেন, তাঁর মুখেই জামায়াতের এমন রাজনৈতিক শক্তির খবর আসা রহস্যজনক। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, বিএনপিকে সাইজ করতে নেপথ্যে থেকে হাসিনাই দিল্লিকে জামায়াতের পক্ষে নামিয়েছেন।

তেল-পানির মিলন: ওয়াহাবি মতাদর্শী মওদূদী চেতনার জামায়াত এবং দেওবন্দ অনুসারী কওমি মাদরাসা-ভিত্তিক ইসলামী দলগুলো (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ইত্যাদি) আদর্শিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও গত ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং ভারতের অ্যাজেন্ডা পিআর পদ্ধতির দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করছে।

তারেক রহমানের কড়া বার্তা ও দিল্লির চটে যাওয়া

বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমানকে যে হাসিনার মতো দিল্লির নাচের পুতুল বানাতে পারবে না, তা ভারত স্পষ্ট বুঝে গেছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’: তারেক রহমান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বার্তা দেন, “সবার আগে বাংলাদেশ। আমি আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ দেখব…।”

পানির হিস্যা ও ফেলানী: তিনি পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, “অবশ্যই আমি দেখতে চাই না যে, আরেক ফেলানী ঝুলে আছে। অবশ্যই আমরা এটা মেনে নেবো না।” এই বক্তব্যে দিল্লি বেজায় চটে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি এখনই সতর্ক না হলে ভারতের চানক্যনীতি ফর্মুলায় জামায়াত দেশের ইসলামী দলগুলোকে নিজেদের ছাতার নিচে নিয়ে যেতে পারে। চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য দলগুলো বিএনপি’র যোগাযোগ পেলে জামায়াতের দিকে ঝুঁকবে না।

নির্বাচনী দৌড়ে কচ্ছপ-খরগোশ উপাখ্যান: প্রতিপক্ষ কি জামায়াত নাকি ‘ভারত’?

আপডেট সময় : ০১:২০:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর ২০২৫

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে এখন ‘কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড় প্রতিযোগিতা’-র উপাখ্যানের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে মগ্ন বিএনপি এখন ইশপের গল্পের ‘খরগোশ’-এর ভূমিকায়, আর নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালানো জামায়াত আছে ‘কচ্ছপ’-এর অবস্থানে। তবে, পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বিএনপি’র প্রধান প্রতিপক্ষ জামায়াত নয়; বরং ভারত-কেন্দ্রিক চানক্যনীতি।

নির্বাচন কমিশন ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণা করবে এবং অর্থনৈতিক দৈন্যদশা থেকে পরিত্রাণ পেতে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন প্রায় নিশ্চিত।

খরগোশ বিএনপি, কচ্ছপ জামায়াত: আত্মতুষ্টির বিপদ

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনে বিএনপি’র প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত। কিন্তু জনসমর্থনের দিক দিয়ে বিএনপি বটবৃক্ষ হলে জামায়াত সুপারিগাছ—এই বাস্তবতায় জামায়াত কখনোই এককভাবে বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারবে না।

খরগোশের আত্মবিশ্বাস: বিএনপি নেতারা ধরে নিয়েছেন যে নির্বাচন হলেই তাঁরা বিজয়ী হবেন। এই প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসে তাঁরা দেশের পীর-মাশায়েখ, মাজার-খানকার অনুসারী, মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং ছোট ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা জরুরি মনে করছেন না।

কচ্ছপের নিরবচ্ছিন্নতা: অন্যদিকে, জামায়াত ভারতের ‘ফুয়েল শক্তিতে’ নির্বাচনী দৌড়ে বিজয়ী হতে কচ্ছপের মতো নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে।

বিএনপি’র আসল প্রতিপক্ষ ভারত, কৌশল জামায়াত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি’র মূল প্রতিদ্বন্দ্বী হলো ‘হিন্দুত্ববাদী ভারত’। নির্বাচনের মাধ্যমে তারেক রহমানকে ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে দিল্লি এবং এ কাজে পর্দার আড়াল থেকে জামায়াতকে সর্বাত্মক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

দিল্লির অ্যাজেন্ডা: সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির (পিআর) নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের মতো দাবিগুলো মূলত আওয়ামী লীগকে আগামী সংসদে পুনর্বাসনের দিল্লির অ্যাজেন্ডা। জামায়াত সেই অ্যাজেন্ডা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

দেওবন্দ কৌশল: ভারত এখন উত্তর প্রদেশের দারুল উলুম দেওবন্দের ইসলামী স্কলারদের ব্যবহার করে কওমি মাদরাসা-ভিত্তিক ইসলামী দলগুলোর নেতাদের মওদূদীপন্থি জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। এই কৌশলে কওমি ঘরানার দলগুলো আদর্শিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও জামায়াতের জোটসঙ্গী হচ্ছে।

রহস্যময় বক্তব্য ও জোটের নেপথ্য

পলাতক শেখ হাসিনা সম্প্রতি ইউটিউবে এক অডিও বার্তায় বলেছেন, “আগে জামায়াত ধরনা দিয়ে বিএনপির কাছ থেকে ২০টি আসন নিয়েছিল। এবার বিএনপিকে ধরনা দিয়ে জামায়াতের কাছ থেকে ২০টি আসন নিতে হবে।”

হাসিনার বক্তব্যের রহস্য: যে জামায়াতকে হাসিনা নিষিদ্ধ করেছিলেন, তাঁর মুখেই জামায়াতের এমন রাজনৈতিক শক্তির খবর আসা রহস্যজনক। রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, বিএনপিকে সাইজ করতে নেপথ্যে থেকে হাসিনাই দিল্লিকে জামায়াতের পক্ষে নামিয়েছেন।

তেল-পানির মিলন: ওয়াহাবি মতাদর্শী মওদূদী চেতনার জামায়াত এবং দেওবন্দ অনুসারী কওমি মাদরাসা-ভিত্তিক ইসলামী দলগুলো (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিস ইত্যাদি) আদর্শিক দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও গত ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং ভারতের অ্যাজেন্ডা পিআর পদ্ধতির দাবিতে যুগপৎ কর্মসূচি পালন করছে।

তারেক রহমানের কড়া বার্তা ও দিল্লির চটে যাওয়া

বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমানকে যে হাসিনার মতো দিল্লির নাচের পুতুল বানাতে পারবে না, তা ভারত স্পষ্ট বুঝে গেছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’: তারেক রহমান বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বার্তা দেন, “সবার আগে বাংলাদেশ। আমি আগে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ দেখব…।”

পানির হিস্যা ও ফেলানী: তিনি পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সীমান্ত হত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, “অবশ্যই আমি দেখতে চাই না যে, আরেক ফেলানী ঝুলে আছে। অবশ্যই আমরা এটা মেনে নেবো না।” এই বক্তব্যে দিল্লি বেজায় চটে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি এখনই সতর্ক না হলে ভারতের চানক্যনীতি ফর্মুলায় জামায়াত দেশের ইসলামী দলগুলোকে নিজেদের ছাতার নিচে নিয়ে যেতে পারে। চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলন ছাড়া অন্য দলগুলো বিএনপি’র যোগাযোগ পেলে জামায়াতের দিকে ঝুঁকবে না।