এএফপির প্রতিবেদন
বন্দুকের মুখে’ শত শত মুসলিমকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে ভারত
- আপডেট সময় : ০৮:১১:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ জুন ২০২৫
- / 388
কোনো ধরনের বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই শত শত মানুষকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়েছে ভারত। এই তথ্য দুই দেশের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, যা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা কড়া সমালোচনা করছেন। তাদের অভিযোগ, এই ধরনের বহিষ্কার বেআইনি এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে করা হচ্ছে। এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ভারত সরকার দাবি করছে যে, যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তারা ‘অবৈধ অভিবাসী’। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসন, বিশেষ করে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা এসব মানুষকে প্রকাশ্যে ‘ঘুণপোকা’ ও ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলে উল্লেখ করেছেন।
মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগের কারণ
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের এমন কঠোর অবস্থানে ভারতের প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মুসলমানের মধ্যে, বিশেষ করে বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের প্রবীণ মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দার বলেছেন, “বিশেষ করে দেশের পূর্বাঞ্চলের মুসলমানরা আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। লাখো মানুষকে অস্তিত্ব সংকটে ফেলা হয়েছে।”
ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সাম্প্রতিক সহিংসতা
২০২৪ সালে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানে ভারতঘনিষ্ঠ সরকারের ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে নয়াদিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কিছুটা শীতল হয়েছে। এর মধ্যেই গত ২২ এপ্রিল ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের কাশ্মীরে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই ছিলেন হিন্দু পর্যটক। ওই হামলার জন্য ভারত পাকিস্তানকে দায়ী করলেও ইসলামাবাদ তা অস্বীকার করে। এই ঘটনার জেরে দুই দেশের মধ্যে চার দিনব্যাপী সংঘাতে ৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।
এই ঘটনার পর ভারতজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা অভিযান চালানো হয়। হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়, যাদের অনেককেই বন্দুকের মুখে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়েছে।
‘হাঁটার সাহস করো না, গুলি করবো!’ – ভয়ংকর অভিজ্ঞতা
আসামের রাহিমা বেগম নামে এক নারী জানান, মে মাসের শেষ দিকে পুলিশ তাকে কয়েক দিন ধরে আটকে রাখার পর বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, তার পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে ভারতেই বসবাস করছে এবং তিনি নিজেও ভারতেই জন্মগ্রহণ করেছেন। তিনি প্রশ্ন করেন, “জানি না তারা আমার সঙ্গে এমন করল কেন?”
রাহিমা জানান, পুলিশ তাকে আরও পাঁচজন মুসলিমের সঙ্গে রাতের অন্ধকারে একটি জলাভূমিতে নামিয়ে দেয়। তাদের হুমকি দিয়ে বলা হয়, “তারা দূরে একটি গ্রামের দিকে দেখিয়ে বলল—ওদিকে হামাগুড়ি দিয়ে যাও। তারা হুমকি দিয়েছিল, দাঁড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করলেই গুলি করবে।”
পরে বাংলাদেশের স্থানীয়রা তাদের খুঁজে পেয়ে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করে। কিন্তু বিজিবি সদস্যরা তাদের আবার ভারত সীমান্তের দিকে ফেরত পাঠায়। ৫০ বছর বয়সী রাহিমা বলেন, “আমরা যখন সীমান্তের দিকে যাচ্ছিলাম তখন ভারতের দিক থেকে গুলি চালানো হয়। আমরা ভাবলাম, এটাই শেষ। আমরা সবাই মরব।” সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। আটকের এক সপ্তাহ পর তাকে আবার আসামে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে শর্ত ছিল—এ বিষয়ে যেন মুখ না খোলেন।
আইনবহির্ভূত পদক্ষেপ ও ‘চিন্তাধারাভিত্তিক ঘৃণার অভিযান’
ভারতের এই অভিযানের তীব্র সমালোচনা করেছেন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবীরা। তারা বলছেন, এই পদক্ষেপ সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। নয়াদিল্লিভিত্তিক মানবাধিকার আইনজীবী সঞ্জয় হেগড়ে বলেন, “কোনো দেশ কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে না, যদি না অন্য দেশ তাকে গ্রহণে রাজি থাকে।” তার মতে, ভারতের আইন অনুসারে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
বাংলাদেশ জানিয়েছে, মে মাস থেকে ভারত ১,৬০০ জনের বেশি মানুষকে জোরপূর্বক সীমান্ত পার করেছে। তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ২,৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডস (বিজিবি) জানিয়েছে, এদের মধ্যে ১০০ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে, কারণ তারা ভারতীয় নাগরিক ছিলেন।
ভারতের বিরুদ্ধে এর আগেও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের জোর করে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। সে সময় ভারতীয় নৌবাহিনী এসব মানুষকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের উপকূলে নামিয়ে দিয়েছিল।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, বর্তমানে যাদের টার্গেট করা হচ্ছে, তারা মূলত বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোর দরিদ্র মুসলিম শ্রমজীবী মানুষ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তবে আসামের মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, তার রাজ্য থেকে অন্তত ৩০০ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এদিকে গুজরাটের পুলিশপ্রধান জানিয়েছেন, রাজ্যে এখন পর্যন্ত ৬,৫০০ জনের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর রাজ্য। অধিকাংশ আটক ব্যক্তি বাংলা ভাষাভাষী ছিলেন এবং পরবর্তীতে তাদের অনেককে ছেড়ে দেওয়া হয়।
মানবাধিকারকর্মী হর্ষ মন্দার বলেন, “যারা মুসলমান এবং বাংলা ভাষায় কথা বলেন, তাদের পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। এটি একটি চিন্তাধারাভিত্তিক ঘৃণার অভিযান।”
৩৫ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রি নাজিমউদ্দিন মণ্ডল জানান, মুম্বাইয়ে পুলিশ তাকে আটক করে এবং একটি সামরিক বিমানে করে ত্রিপুরা সীমান্তে নিয়ে যায়; সেখান থেকে তাকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়। তিনি কোনোমতে ফিরে এসেছেন এবং এখন পশ্চিমবঙ্গের নিজের জন্মভূমিতে রয়েছেন। নাজিমউদ্দিন মণ্ডল বলেন, “আমি আমার সরকারি পরিচয়পত্র দেখালেও তারা শুনল না। আমরা তাদের বলছিলাম আমরা ভারতীয়, কিন্তু তারা আমাদের লাঠিপেটা করছিল। এখন আমি এতটাই ভয়ে আছি যে কাজের খোঁজে বাইরে যেতেও সাহস হয় না।”


























