জাতীয় নির্বাচন: নিবন্ধন নিয়ে তোলপাড়, এনসিপিকে ‘কিংস পার্টি’ আখ্যা
- আপডেট সময় : ১২:৪৭:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫
- / 330
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিবন্ধনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করা ১৪৭টি দলের মধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ‘অধিক গুরুত্ব’ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আবেদন জমা দেওয়া একাধিক দলের নেতারা ইসির আচরণে বৈষম্যের ইঙ্গিত পাচ্ছেন এবং এনসিপিকে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে দেখছেন, যা অতীতের পিডিপির মতো পরিণতি বরণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
গত রবিবার (২২ জুন, ২০২৫), দ্বিতীয় ধাপের শেষ দিনে মোট ২৮টি দল সহ সব মিলিয়ে ১৪৭টি রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য ইসিতে আবেদন জমা দিয়েছে। তবে, ইসির কর্মকর্তারা এনসিপি নেতাদের সঙ্গে যেভাবে বৈঠক করেছেন এবং তাদের প্রতি যে ‘ভিআইপি মর্যাদা’ দেখিয়েছেন, তা অন্যান্য দলের নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
বৈষম্যের অভিযোগ ও এনসিপির বিশেষ গুরুত্ব
আবেদনকারী একাধিক দলের নেতারা অভিযোগ করেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ ইসি এনসিপির নেতাদের সঙ্গে যেভাবে বৈঠক করছেন, অন্যান্য দলগুলোর সঙ্গে তেমনটা হয়নি। তাদের মতে, এনসিপির প্রতি নির্বাচন কমিশনের এই পক্ষপাতিত্ব দেখে মনে হচ্ছে, এনসিপি একটি ‘কিংস পার্টি’ হওয়ায় অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তারা ২০০৭ সালের ‘ওয়ান-ইলেভেন’-এর পর ফেজদৌস আহমেদ কোরেশীর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) উদাহরণ টেনেছেন, যেটি সে সময় অধিক গুরুত্ব পেলেও নির্বাচনে কোনো আসন পায়নি এবং বর্তমানে বিলুপ্তির পথে।
নির্বাচন ও রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো দল নিবন্ধন পাবে কি না, সেটা পরের কথা। তবে ইসির উচিত আবেদনকৃত সব দলকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। তাদের মতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া এনসিপিকে ইসি যেন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এনসিপি নেতারা ছাত্র অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ইসির কাছ থেকে অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন। একজন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ তো এই পর্যন্ত বলেছেন যে, ইসি বৈষম্য করে এনসিপিকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ায় নতুন দলটির নেতাদের এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা উচিত।
ইসি সচিবের ব্যাখ্যা ও এনসিপির প্রস্তুতি
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ ইনকিলাবকে বলেন, “সব মিলিয়ে ১৪৭টি আবেদন জমা পড়েছে। আইন ও বিধি অনুযায়ী এসব দলের আবেদন যাচাই-বাছাই করা হবে। দলগুলো নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে কি না—তা যাচাই করা হবে। তারপর নিবন্ধন ও প্রতীক বরাদ্দের প্রশ্ন আসবে। তাই এ মুহূর্তে এ বিষয়ে কোনো কিছু বলা যাবে না। এখানে কারো বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং কাউকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। আমরা সকলের সঙ্গে সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে চাই।”
জানা গেছে, নিবন্ধনের আবেদন জমা দেওয়ার আগে গত ১৯ জুন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। এর আগেও ২০ এপ্রিল সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে এনসিপির পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল, যেখানে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দলের যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়, খালেদ সাইফুল্লাহ, মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন ও তাজনুভা জাবীন। ওই বৈঠকে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন, রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন, নিবন্ধনের সময়সীমা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রাকভর্তি কাগজপত্র এনে নির্বাচন কমিশনে দলের নিবন্ধন আবেদন করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন নেতা সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “এনসিপির পক্ষ থেকে দল নিবন্ধনের জন্য সব শর্ত পূরণ করে আবেদন করেছি। ১০৫টি উপজেলা এবং ২৫টি জেলায় কমিটি করা হয়েছে। সব কাগজপত্র ইসিতে জমা দিয়েছি। আমরা আশাবাদী দ্রুততম সময়ের মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নিবন্ধন পাবো।” তিনি বলেন, দলীয় প্রতীক হিসেবে তিনটি পছন্দ দিয়েছেন: শাপলা, কলম ও মোবাইল। তাদের প্রথম পছন্দ শাপলা প্রতীক।
অন্যান্য দলের উদ্বেগ ও বিশ্লেষকদের মন্তব্য
জনতা পার্টি বাংলাদেশ (জেপিবি) মহাসচিব শওকত মাহমুদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “সকল রাজনৈতিক দল কি নির্বাচন কমিশনের কাছে সমান গুরুত্ব পাবে? রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছি। নিবন্ধন বিধিমালার যে শর্ত আছে, সেগুলো পালন করা খুব কষ্টকর। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের এ বিধিমালার কিছু কিছু বিধিমালা সংস্কারের প্রস্তাব রেখেছে। সেই প্রস্তাবগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।”
জনতার দলের আহ্বায়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামীম কামাল ও সদস্য সচিব আজম খানও তাদের দল নিবন্ধনের সব শর্ত পূরণ করে আবেদন জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, “রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমমনা উপদলগুলোকে একত্রিত করে দল গঠনের প্রক্রিয়াকেই কিংস পার্টি বলা যেতে পারে… জনগণের সমর্থনে কখনো কিংস পার্টি হয় না। কিংস পার্টি হয় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়, গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায়। এ কারণেই জনসমর্থন পায় না। উত্থান রাজকীয় হলেও জনগণ গ্রহণ না করায় পরবর্তী সময়ে হারিয়ে যায় এসব দল। এটাই বাস্তবতা।”
গণদলের চেয়ারম্যান এটিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী বলেন, “নিবন্ধনের জন্য আবেদন জমা দিতে গিয়ে আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে নিরপেক্ষতা আশা করেছিলাম। কিন্তু সেটা পাইনি, নিবন্ধনেও পাবো বলে মনে হচ্ছে না। সিইসি কিংস পার্টি এনসিপি সভাপতির সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করলেন; অথচ আমাদের দেখা দেননি। মনে হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই নির্বাচন কমিশন কিংস পার্টি এনসিপির পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে গড়ে উঠা এনসিপির উচিত বৈষম্যমূলক সুযোগ বর্জন করা।”


























